প্রযুক্তি ও আমি : মো. জাহিদুল ইসলাম

(প্রিয় টেক) মো. জাহিদুল ইসলাম, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র। পাশাপাশি মুক্ত দর্শনের একজন কর্মী হিসেবে এইচ.এস.টি.ইউ - ওএসএন (HSTU-OSN)-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০৯ সাল থেকে কাজ করছেন একটি অনলাইন রেডিওতে। শুনবো মো. জাহিদুল ইসলামের প্রযুক্তি নিয়ে ভাবনার কথা।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি নিয়ে আপনার ভাবনা?
আমরা উন্নত বিশ্বকে অনুসরণ করি কেবলমাত্র বিনোদন, সংস্কৃতি আর পোশাকে, কিন্তু তাদের মত প্রযুক্তি ব্যবহার কিংবা গবেষণায় আমাদের মোটেও আগ্রহ নেই। আমার কাছে মনে হয় তরুণ প্রজন্ম তথ্য প্রযুক্তিকে ধারণ করতে পেরেছে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি এখনও আত্মস্থ করতে পারেন নি। প্রযুক্তি থেকে সুবিধা আদায় করার মত মানসিক যোগ্যতা অর্জিত হয়নি আমাদের। দেশে যে সুযোগ আর সম্ভাবনা আছে তা দিয়ে আগামী দশ বছরে দেশের চেহারা পালটে দেয়া যাবে।
ভাল উপার্জনের জন্য সবাইকে তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক পেশা গড়তে হবে বিষয়টি এমন নয়, বরং প্রত্যেকের পেশায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারকে কিভাবে যুক্ত করা যায় সে বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। আমাদের দেশে এখনও তথ্য প্রযুক্তি বলতে অফিসে একটা কম্পিউটার আর একটা ওয়েবসাইটকে বোঝায়, এটা দুঃখজনক।
সফটওয়্যার নিরাপত্তা আর পাইরেসি সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অবিলম্বে দেশব্যাপী ওপেন সোর্স সফটওয়ার ব্যবহারে মনযোগী হওয়া উচিত। আপনার প্রতিষ্ঠানে সফটওয়ার কেনা বাবদ খরচ কমাতে চাইলে ওপেন সোর্সের কোন বিকল্প নেই।
আপনার কাছে দেশের প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো কি ?
আগে আব্বু মাঝে মাঝে আমাকে চেক দিয়ে ব্যাংকে পাঠাতেন টাকা তোলার জন্যে। আমি যেতে চাইতাম না, কারন একবার টাকা তোলার জন্য দু'জন অফিসারের সই নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে চেক জমা দিতে হত। ভয়ে ভয়ে থাকতাম যদি কোন ভুল হয়ে যায়। আজকের ক্রেডিট কার্ডের গল্পটা কারুরই অজানা নয়। ব্যাংক, বীমা, সরকারী এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কম্পিউটারের মাধ্যমে তাদের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। এস.এম.এস-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম পুরন এবং ফলাফল প্রকাশের বিষয়টি ভাল লেগেছে । মোবাইল ফোনের মাধ্যমে টাকা প্রেরণের পদ্ধতিটি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ।
আপনি কি কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন?
বন্ধুদের সাথে কোন বিষয় নিয়ে তর্ক হলে সেটি আর বাড়তে দেই না, চট করে গুগল থেকে যাচাই করার বিষয়টি নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অনেক সময় দেখা যায় কারো নামটাই শুধু জানি আর কিছু জানি না, কিন্তু গুগল থেকে তার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করে তার সাথে যোগাযোগ করেছি।
বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এবং পরামর্শের জন্য কয়েকটি গ্রুপ এবং ফোরাম নিয়মিত অনুসরণ করি। এদের মধ্যে “চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব” এবং “আমাদের প্রযুক্তি” উল্লেখযোগ্য।
আমার সহপাঠী এবং কিছু শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে একটি ওডেস্ক টিম গড়ে তুলেছি, এর মাধ্যমে আমরা আমাদের ফ্রীল্যান্সিং কার্যক্রম পরিচালনা করছি।
আপনি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কী করেন ?
আমাকে এক রকম ওপেন কনসালটেন্ট বলা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী এবং জুনিয়রদের ফ্রীল্যান্সিং শেখা থেকে শুরু করে টাকা উঠানো পর্যন্ত সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে আসছি। ২০১০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে ফ্রীল্যান্সিং নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেছি। তাছাড়া ব্যক্তিগত ভাবে দিনাজপুর এবং রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আগত অনেককে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতা করেছি।
সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের যাত্রা লগ্ন এর সাথে সম্পৃক্ত আছি। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপেন সোর্সকে জনপ্রিয় করার জন্যে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু নিয়মিত ব্যবহারকারী তৈরি হয়েছে। সামনের দিন গুলোতে আরও ভাল কিছু দিতে পারব বলে আশা রাখি।
আপনি কোন মডেলের মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করেন?
ল্যাপটপ: Dell Inspiron N4110
মোবাইল: SAMSUNG DUOS C222
প্রযুক্তির উন্নতির জন্য সরকারের আর কি করা উচিত ?
সময়ের প্রেক্ষিতে তরুণ প্রজন্মের আরও দুটি মৌলিক অধিকার যুক্ত হয়েছে নিত্যদিনের তালিকায়। একটি হল বিদ্যুৎ এবং অন্যটি ইন্টারনেট। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গবেষণা এবং প্রযুক্তির বিকাশকে এগিয়ে নিতে হলে দ্রুত গতির ইন্টারনেটের কোন বিকল্প নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবছর বিদ্যুৎ অপচয়ের জন্য যে টাকা ভর্তুকি দিতে হয় তার ২০ ভাগ যদি দ্রুত গতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করার জন্যে খরচ করা যায়, তাহলে দেশে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন একটা ইতিবাচক মাত্রা পাবে বলে আমার বিশ্বাস।
তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের একটু আন্তরিক ভাবে ভাবা উচিত। তথ্য প্রযুক্তিবিদদের পরামর্শ নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়া উচিত। আমরা দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে ডিজিটাল বাংলাদেশ কথাটার অর্থ ঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে পারিনি।
ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে চোখের ইশারায় বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। এখনও পর্যন্ত যতটুকু অর্জন সেটা ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফসল। সরকারের কিছু মৌলিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী দেশের সুনাম, আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠাকে পুঁজি করে প্রতিযোগিতার বাজারে ভারত এবং ফিলিপাইনকে পেছনে ফেলা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আপনার কি মনে হয় প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের আবেগকে কমিয়ে দিচ্ছে ?
অবশ্যই কমিয়ে দিচ্ছে, ছোটবেলায় মামা বাড়ি যাব বলে গল্পগুলোকে জমিয়ে রাখতাম। কিন্তু এখন পরিচিত মানুষগুলো দূরে থাকলেও প্রতিদিনকার গল্পগুলো প্রতিদিন বলা হয়ে যায়। শেষ চিঠি লিখেছিলাম কলেজে পড়ার সময়, কাগুজে পত্রিকাও অনেক সময় পড়া হয়ে উঠে না। মাঠে খেলাধুলা করা এবং দেখার চাইতে ১৪ ইঞ্চি মনিটরের বিনোদন অনেক সময় বেশি আকাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠছে।
আপনি কি কি সামাজিক সাইট ব্যবহার করেন ?
পরিচিত সবার সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়, সে কারনে ফেসবুক ছাড়া অন্য কোন সামাজিক যোগাযোগের সাইটে আমার উপস্থিতি নেই।
আপনি কি ব্লগে লিখেন। কোন বিষয় নিয়ে ব্লগে লিখেন ?
ব্লগ লিখি বলা যাবে না, লিখতাম। প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, আসন বিন্যাস, ফলাফল, ভর্তির নিয়মাবলী সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিয়ে ব্লগ লিখতাম। ব্যস্ততার কারনে নিয়মিত লেখা হয়ে উঠে না। মুক্ত ব্লগিং প্লাটফরম গুলোতে আর্থসামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মাঝে মাঝে লিখি।
প্রযুক্তির কোন বিড়ম্বনা ?
প্রযুক্তির মাত্রারিক্ত আসক্তি একদল অসামাজিক মানুষের জন্ম দিচ্ছে। এই যন্ত্রদানবদের মধ্যে সততা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা আর সামাজিকতার চর্চা শূন্যের কোঠায়। উদারতা আর মুক্তবুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়াটাকেই সবচাইতে বড় বিড়ম্বনা মনে করি আমি।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভবতা ?
চোখ বন্ধ করে বলব, আমাদের দেশ প্রযুক্তি বিকাশের পথে শতভাগ অনুকূল। পৃষ্ঠপোষকতা আর সচেতনতা দরকার। এই শতাব্দীতেও তথ্যপ্রযুক্তির নাম করে কিছু মানুষ আপামর জনসাধারণকে ধোকা দিয়ে যাচ্ছে। চালিয়ে নিচ্ছে অনৈতিক ব্যবসা। এর জন্য দেশের কাছে দায়বদ্ধ থাকব প্রযুক্তি সচেতন আপনার আমার মত মানুষ। কারন আমাদের কিছু সময়োচিত পদক্ষেপ, হয়ত সম্ভাবনার আলোকে অসময়ে নিভিয়ে দিবে না।












