প্রযুক্তি ও আমি : আশিফ নেওয়াজ

(প্রিয় টেক) আশিফ নেওয়াজ, অনলাইনে আশিফ শাহো নামেই পরিচিত। পেশায় একজন ছাত্র, পড়াশোনা করেন কম্পিউটার বিজ্ঞানে। পড়াশোনার পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে যুক্ত রয়েছেন ওডেস্কের সাথে। প্রযুক্তি ও আমি-তে এবার আমরা জানবো আশিফ নেওয়াজের ভাবনাগুলো।
বাংলাদেশের প্রযুক্তি নিয়ে আপনার ভাবনা?
বাংলাদেশের প্রযুক্তি নিয়ে অনেক আশাবাদী। আমি স্বপ্ন দেখি দেশের অনেকে প্রযুক্তিকে পেশা হিসাবে নিবে। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশ্বের দুয়ারে আমাদের দেশটা পরিচিতি পাবে। আসলে এমনটা শুধু স্বপ্নেই নয়, বাস্তবেও অনেকখানি এগিয়ে নেয়া সম্ভব যদি কিনা আমরা মেধা পাচার বন্ধ করতে পারি। অভিজ্ঞ বা মেধাবীদের প্রথম ইচ্ছা থাকে বাইরে চলে যাওয়া। পর্যাপ্ত ক্ষেত্র তৈরি করতে পারলে হয়তো তখন আর কেউ দেশ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে না। এজন্য দরকার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। গত এক বছরে বাংলাদেশের আউটসোর্সিং খাতের অভাবনীয় সাফল্য ইঙ্গিত দেয় যে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

আপনার কাছে দেশের তথ্য প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো কি ?
আমাদের দেশে প্রযুক্তির পরিপূর্ণ সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য যদিও তেমন ব্যবস্থা নেয়া হয় নি, তারপরও মানুষ প্রযুক্তির সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। ইন্টারনেট শুধু ফেসবুক বা চ্যাটিং-এর জন্য এই ধারনা থেকে মানুষ এখন বেড়িয়ে এসেছে। ভালো দিকগুলো কথা বললে প্রথম যে দুটো কথা বলবো সে দুটো হলো, ইন্টারনেটে পড়াশুনা করা এবং তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আউটসোর্সিং করা।
আপনি কী কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন?
দিনের শুরু থেকে শেষ প্রায় সবসময়ই আমি ইন্টারনেটের সাথেই থাকি। মূলত আমি ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকি, বন্ধুবান্ধব, ক্লায়েন্ট এবং কমিউনিটির সাথে যোগাযোগ করার জন্য, উইকিপিডিয়া এবং আমার কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত সাইটগুলোতে পড়াশুনা করার জন্য, নিজের সাইটগুলো দেখাশুনা করা এবং আউটসোর্সিং মার্কেট প্লেসগুলো চোখ রাখা।
আপনি কি তথ্যপ্রযুক্তি ব্যাবহার করে ফ্রিল্যান্স কি কাজ করেন?
আমি একজন ফ্রিল্যান্স ডিজাইনার, আমার কাজ হল কোন কিছুর বাহ্যিক রূপটি তৈরি করা। আমার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে আছে আইফোন বা অ্যানড্রয়েড ফোন অ্যাপ-এর ডিজাইন এবং ওয়েব সাইট ডিজাইন।
আপনি কোন মডেলের মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করেন?
আমার ল্যাপটপটি অ্যাসার অ্যাস্পায়ার ওয়ান ৭২২ মডেলের, ডেক্সটপ আসলে একটি ক্লোন কম্পিউটার এএমডি ফেনোম টু কনফিগারেশনের, আর ফোন হিসেবে নোকিয়া ২৭০০ সি এবং ১২০২ ব্যবহার করি।
তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির জন্য সরকারের আর কি কি করা উচিত ?
স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের প্রথমেই উচিত ইন্টারনেট সহজলভ্য করা, উচ্চ গতির ব্যবস্থা করা আর সাথে অবশ্যই বিদ্যুৎ এর নিশ্চয়তা। এর সাথে আর একটু যোগ করে সরকারের কাছে অনুরোধ, সময় এসেছে IT Village করার, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণের সুবিধার জন্য যেমন সকল সুবিধা দিয়ে Export Processing Zone (EPZ) বানানো হয়েছে ঠিক তেমনি, তথ্য প্রযুক্তি গবেষণা এবং তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সুবিধার্থে IT Village তৈরি করা, এখন সময়ের প্রয়োজন। যেখানে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা থাকবে এবং প্রচুর আইটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যা আমাদের দেশে বড় বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রসারিত করবে। ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ের সাথে যুক্ত হতে দেরী করে আমাদের সরকার একটি ভুলটি করেছিল। এখন এই ভুলটি আবার করলে আমরা অতীতের মত পিছিয়ে যাব, রুদ্ধ হয়ে যাবে স্বাভাবিক অগ্রগতি।
আপনি কি কি সামাজিক সাইট ব্যবহার করেন ?
টুইটার, ফেসবুক এবং জি+
বাংলাদেশের ইন্টারনেট সার্ভিস নিয়ে কোন বিরম্বনা ?
মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষকে যান্ত্রিক করে দেয়, আবেগহীন এবং অস্বাভাবিক করে তোলে। তবে প্রযুক্তি নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি বিড়ম্বনার মুখোমুখি হই। সেটা হলো অনেকদিন আগের কথা আমি তখন ওডেস্কে নতুন কাজ শুরু করেছি। ক্লায়েন্ট আমাকে একটা ট্রান্সপারেন্ট ম্যাপের কাজ দিয়েছিল, যথারীতি আমি কাজটি করলাম এবং পাঠাতে গিয়ে পরলাম বিপদে, আমি সারারাত জেগে ২৮ মেগার ফাইলটি পাঠানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না! সকালের দিকে বহু চেষ্টায় ফাইলটি আমার হোস্টিং-এ আপ করলাম এবং নিশ্চিন্তে ঘুমাতে গেলাম। ঘুম থেকে উঠে ক্লায়েন্টের মেসেজ পেলাম “The file is broken, please send it again” উল্লেখযোগ্য কিনা জানি না তবে এই মুহূর্তে এটাই মনে পড়লো।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ?
বাংলাদেশ প্রযুক্তির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। জানামতে বাংলাদেশে অনেক বড় বড় প্রযুক্তিবিদ আছেন যাদের পেশা রিলেটেড কোন ডিগ্রীই নেই। তারা নিজেদের চেষ্টায় এতদূর এসেছেন। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এবং অদক্ষ সার্টিফিকেটধারী হওয়ার চিন্তাভাবনা থেকে ছাত্রদের দূরে সরিয়ে আনতে পারলে এদেশেও অনেক বড় বড় প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা সম্ভব। আমি স্বপ্ন দেখি স্টিভ জবস, মার্ক শাটলওর্থ, ডেনিশ রিচি-এর মত মানুষ এদেশে তৈরি হবে।
দুটি ব্যাপার আমাকে দুঃখ দেয়, এগুলো হল অযথা পাইরেসি করা আর পিটিসি-এর মহাপ্লাবন। আমাদের উচিত এগুলো থেকে দুরে থাকা।
পাইরেসি কোন ভাল কিছু না, চেষ্টা করা উচিত পাইরেসি থেকে দুরে থাকার জন্য। একটা সময় ছিল যখন মানুষকে বাধ্য হয়ে পাইরেসি করতে হত কিন্তু এখন সময় বদলেছে, অনেক মুক্ত এবং ওপেন সোর্সের বিশ্বব্যাপী চর্চার ফলে এবং যথেষ্ট মুক্ত সফটওয়ার এখন খুব সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। শুধু সাধারণ ব্যবহারকারীরাও নয় প্রফেশনালরাও পাইরেসি ছাড়া চলতে পারেন না। এটা ঠিক যে পাইরেসি একদিনে বন্ধ করা সম্ভব না কিন্তু আমাদের উচিত পাইরেসিকে নিরুৎসাহিত করা এবং বাংলা কমিউনিটিগুলোতে এই পাইরেসি বিরোধী মনোভাবে সোচ্চার হওয়া।
পিটিসি করে কোনদিন ভাল আয় করা যায় না, এটা সম্মানজনক পেশাও না, এটা করে জীবনধারণও সম্ভব না বা এটা কোন উপার্জনের সঠিক রাস্তাও না। MLM-এর জন্য মানুষকে চোখের সামনে দেখছি লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করতে, কিন্তু নিজেও জানে না লাভ পাবে কিনা। আমি বিশ্বাস করি যে জীবনে কাজ না করে মেধা ব্যয় না করে ইনকাম করতে চায় সে কোনদিন সফল হবে না। হয়তো হতে পারে কিছু অবৈধ টাকার মালিক।
তারপরও যে বুঝে না তাকে বুঝানো সম্ভব না, পাবনা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্রকে অনুরোধ করেছিলাম পিটিসি বাদ দিয়ে কোন ভাল কাজ করতে, তার উত্তর ছিল “আমিতো টাকা পাচ্ছি তো সমস্যা কি? আমার টাকা পাইলেই হল।”
সবাইকে অনুরোধ ছোট বাচ্চা ভুলে কম্পিউটারের ভুল বাটন চাপতেই পারে এতে রেগে যাওয়ার কিছু নেই, সবাইকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আমাদেরকেই সঠিক পথে আনতে হবে।












