রঙ পরিবর্তনকারী ছদ্মবেশী রোবট

PriyoTech's picture

(প্রিয় টেক) পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে নিজের রঙ পরিবর্তন করতে পারে এমন প্রাণীর কথা আমরা সকলেই জানি। বিশেষ করে সরীসৃপ, গিরগিটি, অক্টোপাস জাতিয় প্রাণী সাধারণত শত্রুকে ধোঁকা দেবার জন্য রঙ পরিবর্তন করে পরিবেশের মধ্যে লুকিয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে প্রাণীর এই বৈশিষ্ট্যটি নকল করার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এমন একটি রোবট তৈরি করেছে যা রঙ পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে অথবা সকলের সামনে উজ্জ্বল ভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম।

এই রোবট তৈরিতে অক্টোপাস, কাটলফিশ এবং স্কুইডের মত সামুদ্রিক প্রাণীর ছদ্মবেশ দক্ষতা বিজ্ঞানীদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। এই শামুক জাতীয় প্রাণীগুলোর মতই রোবটটির দেহ অত্যন্ত নরম, রাবারের মত দেহ এবং যে কোন দিকে নড়াচড়া করে পারে।

গবেষক দলটি ২০১১ সালে জাতিয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির পরিকল্পনা (পিএনএএস) সূচক সাময়িকীতে গুটিগুটি পায়ে (ক্রল?!) এবং যে কোন বাঁধাকে শরীর বাকিয়ে পার হতে পারে এমন নমনীয় রোবট সম্পর্কে বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করেন।

"নমনীয় রোবট" বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। এবার সেই রোবটটির সঙ্গে ক্যামোফ্লেজ বা ছদ্মবেশ ধরার বিষয়টি যুক্ত করলেন গবেষকেরা।

সম্প্রতি গবেষণাটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে অধ্যাপক জর্জ হোয়াইটসাইড বলেন, "প্রচলিত রোবোটিক্স ক্ষেত্রটিতে অত্যন্ত উন্নত ধরণের গবেষণা পরিচালিত হয়, এবং আপনি যদি বিভিন্ন রোবট পর্যবেক্ষণ করেন তাহলে অধিকাংশই যে স্তন্যপায়ী প্রাণীর শরীরের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে তা বুঝতে পারবেন।"

গবেষক দলটি রোবটের এই সনাতন ধারণা থেকে সরে এসে নমনীয় প্রাণী যাদের হাটা চলার মত কাজের জন্য অন্য ধরণের দেহ কাঠামো সহ ছদ্মবেশ ধারণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে এমন রোবট নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

সিলিকন-ভিত্তিক পলিমারে তৈরি করা এই রোবটটি চলাফেরার জন্য ব্যবহার করে বাতাসের চাপ। এর চারপায়ে রয়েছে ক্ষুদ্র সিলিন্ডার, যার মাধ্যমে বাতাসের চাপ সৃষ্টি করা হয় এবং রোবটটি চলাফেরা করতে পারে। এই ছদ্মবেশী-বটের দেহের উপরিভাগে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চ্যানেলের বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। এই চ্যানেলগুলোর মাঝ দিয়ে বিভিন্ন রঙ পাঠানোর মধ্যে দিয়ে রোবটটি তার দেহের রঙ দ্রুত পরিবর্তন করতে সক্ষম।

রঙের পাশাপাশি ঠাণ্ডা এবং গরম পানি পাম্প করার মাধ্যমে থার্মাল ক্যামোফ্লাজ তৈরি করাও সম্ভব। আর যদি তরল ফ্লুরোসেন্ট ব্যবহার করেন তাহলে অন্ধকারের মধ্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে রোবটটি।

বিজ্ঞানীরা বর্তমানে একটি আধার থেকে তরল পদার্থ সরবরাহ করলেও ভবিষ্যতে রোবটটির দেহের মাঝে আধার যুক্ত করা হবে বলে জানান তারা।

গবেষণা প্রবন্ধটির প্রধান লেখক স্টিফেন মরিন নমনীয় যন্ত্রটিকে মানব দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং কোষের সাথে তুলনা করেন এবং বলেন, '(আমাদের) পরিকল্পনা হচ্ছে এমন একটি সিস্টেম তৈরি করা যা মাংসপেশির গতি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অনুকরণ করতে পারে এবং একটি সিস্টেম তৈরি করা যা তরল পদার্থ প্রবাহিত করতে সক্ষম। এবং এই দুটি সিস্টেমকে সমন্বয়ের মাধ্যমে এমন একটা ডিভাইস তৈরি করা যা ডাক্তারদেরকে নির্দিষ্ট অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে সাহায্য করবে।

অর্থাৎ তারা কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করতে আগ্রহী। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, ধরুন কোন রুগীর হৃদযন্ত্রে সমস্যা হয়েছে। প্রযুক্তিটি ব্যবহার করে অস্ত্রোপচার করার আগে ডাক্তার রুগীর সকল সমস্যা যুক্ত কৃত্রিম একটি হৃদযন্ত্রের উপর পরীক্ষা চালাতে পারবে ফলে ভুলের হার কমে যাবে। অথবা নতুন ডাক্তারদের প্রশিক্ষণের জন্য এই ধরণের কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করা যাবে। এতে মরদেহের উপর পরীক্ষা চালানোর হারও কমে যাবে।

এছাড়া অনুসন্ধান এবং রক্ষামূলক কাজেও এই রোবটগুলো ব্যবহার করা যাবে বলে জানান হোয়াইটসাইড। উদ্ধার কাজের সময় অন্ধকারে উদ্ভাসিত হবার বৈশিষ্ট্যটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

হালকা ওজনের, নমনীয় এবং অত্যন্ত কমদামের কারণে উদ্ধারকারী রোবট হিসেবে এগুলো আদর্শ বলে উল্লেখ করেন হোয়াইটসাইড। তিনি বলেন, "অন্যান্য রোবট থেকে ভিন্ন আকৃতির হবার কারণে এবং অত্যন্ত সরল সিস্টেম থেকে যে জটিল মোশন পাওয়া সম্ভব তা এই সিস্টেমের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য।"