নিনজা টেল: ডেফকনে হ্যাকারদের তৈরি প্রাইভেট ফোন নেটওয়ার্ক

oritro.ahmed's picture

(প্রিয় টেক) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাসভেগাসের রিও হোটেলে অনুষ্টিত হল ২০ তম বার্ষিক হ্যাকার সম্মেলন ডেফকন ২০১২। আর এ অনুষ্ঠানে নিনজা হ্যাকাররা তৈরী করে "নিনজা টেল" নামক নিজস্ব জিএসএম মোবাইল নেটওয়ার্ক। যারা নিজেদের জীবনের একটা বড় সময় পার করেছেন ফোন নেটওয়ার্ক গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙ্গে বিনামূল্যে কল করার চেষ্টা করে। তারাই আজ জিএসএম নেটওয়ার্ক এবং আনড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ভিত্তিক ফোনের জন্য সৃজনশীল ও মজার কিছু অ্যাপস তৈরী করেন।

নিনজা টেলের পক্ষ থেকে দেয়া হয় অ্যানড্রয়েড ৪.০.৩ ভিত্তিক "এইচটিসি ওয়ান ভি" মডেলের হ্যান্ডসেট। পেয়েছে সেই সকল ভাগ্যবানেরা যারা হ্যাকার কমিউনিটিতে অবদান রেখেছেন অথবা নিনজা টেলের বন্ধু হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, এই ফোন এবং এর সাথে থাকা গলায় ঝোলানো ফিতাটি বার্ষিক নিনজা পার্টিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে 'ব্যাজ' হিসেবে পরোক্ষভাবে কাজ করেছে। অবশ্য ডেফকনে যারা অংশ নিয়েছে তারা রক্তদানের অথবা বোন ম্যারো দানের কাগজে স্বাক্ষর অথবা ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশনে অর্থ দানের মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারবেন।

নিনজা ফোনের কলগুলো ডেফকনের নিজস্ব ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক কিংবা নিনজা টেলের প্রাইভেট জিএসএম নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চালানো সম্ভব। তবে নেটওয়ার্কটি এনক্রিপ্টেড ছিল না।

নিনজা ফোনে ব্যবহৃত হয়েছে অ্যানড্রয়েড ৪.০.৩ এর হাইলি কাস্টমাইজড সংস্করণ যাকে নিনজা ওএস (Ninja OS) বলা হয়। নিনজা টেলের সাথে যুক্ত হবার জন্য সাথে দেয়া হয়েছে একটি কাস্টমাইজড নিনজা সিম কার্ড। ডেফকন ২০ শেষ হওয়ার পর এটাকে যে কোন অ্যানড্রয়েড সংস্করণে আপগ্রেড করা যাবে। ব্যবহার করা যাবে যে কোন সিমকার্ড। তবে নিনজা টেল ডেফকন ২০ এর সমাপ্তির সাথে সাথেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে সর্বমোট ৬৫০টি ফোন দেয়া হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।

নিনজা টেলের নিনজা মাইকেল জে. জে. টিফ্যানী বলেন "নিনজা টেল এখন পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত বিটিএস ( Open BTS ) নেটওয়ার্ক।" এই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এর সফটওয়্যার ভিত্তিক সুইচিং প্রযুক্তিটি ছোট্ট স্থান বা ভ্যানের মধ্যে থেকে ব্যবহার করা যায়।

মজার ব্যাপার হলো, একটা সার্ভিস ভ্যান থেকে গোটা নিনজা টেল অপারেট করা হচ্ছিলো। সেখানে ছিলো ১২ ফুট লম্বা একটা অ্যান্টেনা, নেটওয়ার্কিং এবং ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন সার্ভার, এবং পাশে একটা গ্রাহক সেবা টেবিল। পুরো সেটআপ সহ ভ্যানটি ডেফকনের একটা বিশাল রুমে পার্ক করা অবস্থায় ছিলো। পুরো সেটআপটি তৈরি করতে টিফ্যানির প্রায় ১০ মাস লেগেছিল বলে জানান।

নিনজা ফোনকে সাজানো হয় নানা ধরনের চমকপ্রদ অ্যানড্রয়েড অ্যাপস এর কাস্টমাইজড ভার্সন দিয়ে। পাঁচটি পেজ প্রিলোডেড অ্যাপ্লিকেশন দ্বারা ভর্তি ছিলো। এছাড়া যে কোন অ্যানড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন যোগ করার সুবিধাতো ছিলই। 'দ্যা নিনজা গেম' নামের একটা গেম যা 'জাঙ্কেন' নামের একটা গেমকে পরিবর্তন করে বানানো। ছিলো 'ওকে নিনজা' নামের একটা চ্যাটিং অ্যাপ্লিকেশন, অ্যানড্রয়েড ফোন থেকে সরাসরি কোড লিখে নতুন অ্যানড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন বানানোর সুবিধা। এছাড়া সরাসরি অ্যানড্রয়েড আইডিই ( Android IDE) ব্যবহার করে নতুন অ্যাপ তৈরির সুবিধাও ছিল। নিনজা টেল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা ফোন কল, বার্তা প্রেরণ, চ্যাট এবং কনফারেন্স কল পর্যন্ত করেছে।

নিনজা টেলের ব্যবহারকারীরা যেন কে ফোন করলো তা জানতে পারে সেজন্য আগে থেকে ছবি তুলে নেয়ার সুবিধাও ছিলো। ব্যবহারকারীদেরকে নিজের নম্বর এবং ইউজারনেম পছন্দমতো বেছে নেয়ার সুবিধা দেয়া হয়েছিলো।

নিনজা ফোনের মূল ব্যয় বাহক হিসেবে ছিলো বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ফেসবুক, অনলাইন গেমিং জগতের আরেক তারকা জিঙ্গা, লুকাউট মোবাইল সিকিউরিটি এবং অলজয়েন। অ্যানড্রয়েড ওএসটি ডেভেলপের কাজে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রোগ্রামাররা কাজ করেছে।

নিনজা টেল তাদের ছোট ছোট বিষয়ের প্রতি খেয়াল রেখেছিলো। তাদের ভ্যানের গায়ে থাকা লোগো এবং ফোনটির ইন্টারফেসের পুরনো দৃশ্য এবং ক্লাসিক এলিমেন্টগুলো ডিজাইন করেন পিঙ্গুইনো। তিনি বিখ্যাত স্টুডিও ইউনিভার্সাল এর একজন ডিজাইনার।

লাল বাঁকানো তারার মতো এ লোগোর কারণে নিনজা টেলের প্রকাশটা অনেক বেশি প্রফেশনাল ছিলো। যারা ভেতরে কাজ করছিলেন সবার মাথায় ছিলো নিনজা টেলের লোগো সম্বলিত সেফটি হ্যাট।

তবে এই পুরো সেটআপের জন্য কতো খরচ হয়েছে তা জানাতে অস্বীকৃতি জানায় টিফ্যানি। তিনি বলেন "নেটওয়ার্কটি তৈরি করার ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য ছিল ব্যবহারকারী এমন একটি অভিজ্ঞতা দেয়া যা কিশোর বয়স পার হবার পর আর তারা উপভোগ করেনি।" তিনি আরো বলেন "একে শুধু একটা ফোন নেটওয়ার্ক ভাবলে ভুল হবে, এটি এমন একটি ফোন নেটওয়ার্ক যার সাথে পাবেন অনেক কিছু...আমরা অবকাঠামোটি তৈরি করে দিয়েছি মাত্র, ব্যবহারকারীরাই নেটওয়ার্কে নিয়ে এসেছে নূতন মাত্রা। এটা একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা।"

যেহেতু ডেফকম হ্যাকারদের সম্মেলন সেহেতু এই নেটওয়ার্কটিকে যে কেউ কেউ হ্যাক করতে চেষ্টা করবে সে তো জানা কথাই, বরং না হলেও বিস্মিত হতে হত। কিন্তু টিফ্যানী জানান একবারই এমন চেষ্টা করা হয় এবং নিনজা টেল তা ঠেকাতেও সক্ষম হয়েছে।

টিফ্যানী শেষে বলেন "আমরা গঠনমূলক একটি দল। আমাদের একটা নাম রয়েছে যা আমরা তৈরি করেছি ভালো পথ অবলম্বন করে। কোন কিছু না ভেঙ্গে, কিংবা ধ্বংস না করে। আমরা আমাদের নেটওয়ার্ক বানিয়েছি। এটাই নিনজা স্টাইল।"