ইন্টেলের "থ্রিডি ট্রানজিস্টার" প্রযুক্তি সম্বলিত আইভি ব্রিজ প্রসেসর

(প্রিয় টেক) প্রথমবারের মত "থ্রিডি ট্রানজিস্টার" বৈশিষ্ট্যযুক্ত আইভি ব্রিজ প্রসেসর উন্মোচন করতে চলেছে ইন্টেল। মার্কিন প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে নতুন এই উদ্ভাবনের ফলে কম্পিউটারের প্রসেস করার ক্ষমতা বেড়ে গেলেও বিদ্যুৎ খরচ যাবে কমে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে তারা ১৩ টি ডেস্কটপ কোয়াড-কোর প্রসেসর ছাড়লেও পরবর্তীতে আলট্রাবুক এবং পাতলা ল্যাপটপের জন্য বেশ কিছু ডুয়েল কোর প্রসেসর বের করা হবে।


ইন্টেল-এর পিসি ব্যবসায়িক প্রধান কার্ক স্ক্যাজেন প্রসেসরগুলোকে বিশ্বের প্রথম ২২ ন্যানোমিটার প্রসেসর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এগুলো আগের প্রজন্ম অপেক্ষা এগুলো ২০% বেশি শক্তিশালী হলেও ২০% বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী।
চালু এবং বন্ধ যত দ্রুত সম্ভব করার জন্য ঐতিহ্যগতভাবে ট্রানজিস্টারগুলোতে "ফ্ল্যাট" প্ল্যানার গেটস ডিজাইন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এর ফলে চালু অবস্থায় সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ এবং বন্ধ অবস্থায় সর্বনিম্ন বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়ে থাকে।
আইভি ব্রিজের ক্ষেত্রে ট্রানজিস্টারের গেট মাত্র ২২ এনএম লম্বা (১ ন্যানোমিটার = ১ মিটারের ১ বিলিয়ন ভাগের ১ ভাগ)।
ইন্টেল ২০১৩ সালের মাঝে ১৪ ন্যানোমিটার ও ২০১৫ সালের মাঝে নাগাদ ১০ ন্যানোমিটার ট্রানজিস্টার তৈরি করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
সমস্যা হচ্ছে সুইচের গতির ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা না হলে প্ল্যানার গেটগুলো ছোট হওয়ার সাথে সাথে তাদের এনার্জি অবচয়ের পরিমাণও বেড়ে যাবে।

ইন্টেল এই সমস্যা সমাধান করেছে ট্রানজিস্টারের টুডি (2D) গেটগুলোকে থ্রিডি (3D) গেটে পরিবর্তন করার মাধ্যমে। ইন্টেল এই টুডি গেটগুলোর স্থানে অতি সূক্ষ্ম পাতলা পাখা ব্যবহার করেছে যা সিলিকন পৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে উঠেছে। প্রতিটি পাখাকে ঘিরে রেখেছে তিনটি গেট - প্রতি পার্শ্বে দুটি এবং উপরটা জুড়ে রয়েছে আরেকটি।

নতুন এই প্রক্রিয়ায় একই জায়গায় আরও অনেক ট্রানজিস্টার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব এই সুবিধা ছাড়াও এক্ষেত্রে আরও বেশ কিছু সুবিধা আছে।
- এনার্জি অবচয়ের হারটি শূন্যের কাছে নেমে আসা স্বত্বেও গেটগুলো প্রতি সেকেন্ডে ১০০ বিলিয়নের বেশি বার সুইচ অন এবং অফ করতে সমর্থ হবে।
- একই কাজ করতে আরও কম শক্তির প্রয়োজন হবে।
- চিপ নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন এই উদ্ভাবন মাত্র ২-৩% খরচ বাড়িয়ে দিবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবার প্রয়োজন কেন?
ইন্টেলের নতুন ট্রানজিস্টার প্রযুক্তি - যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে রয়েছে চালু / বন্ধ করার ব্যবস্থা। ফলে প্রসেসরগুলো হয়ে উঠেছে অনেক বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী। ইন্টেলের ভবিষ্যৎ সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করছে এই বৈশিষ্ট্যের উপর। প্রতিষ্ঠানটির প্রসেসর অত্যধিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করার কারণে এখন পর্যন্ত স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট বাজারে প্রবেশ করতে পারেনি ইন্টেল।
স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেট বাজার মূলত দখল করে রেখেছে আর্ম চিপসেট। আর ইন্টেল দ্রুত অগ্রসর না হলে এই বাজারে প্রবেশ করা প্রতিষ্ঠানটির জন্য আরও কঠিন হয়ে যাবে যখন এ বছরের শেষে মাইক্রোসফট তার নতুন ওএস উইন্ডোজ এইট বের করবে। এ বারই প্রথম মাইক্রোসফট বিশেষ ভাবে আর্ম অবকাঠামো নির্ভর উইন্ডোজ আরটি সংস্করণটি বের করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে পিসি নির্মাতারা এমন ল্যাপটপ তৈরি করতে সক্ষম হবে যেগুলো ব্যাটারি সাশ্রয়ী হবে আবার ওএস হিসেবে উইন্ডোজ থাকার কারণে অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।
ত্রিমাত্রিক ট্রানজিস্টার:
ইন্টেল আশা করছে নতুন এই ট্রানজিস্টার প্রযুক্তি তাদেরকে এক্ষেত্রে সাহায্য করবে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে তারা এই প্রযুক্তি উন্নয়নের পেছনে ১১ বছর ধরে কাজ করছেন।
১৯৪৭ সালে বেল ল্যাবে সর্বপ্রথম ট্রানজিস্টার নির্মাণ করা হয় যার আকার ছিল মার্কিন পেনির সমান। তারপর থেকে প্রকৌশলীরা এদের আকৃতি দিন দিন আরও ছোট করে এনেছে - যার ফলে, বর্তমানে একটি প্রসেসরের মাঝে এক বিলিয়নের অধিক ট্রানজিস্টার ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
ইন্টেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুর (মুরের আইন) বলেন, কোন খরচ না বাড়িয়ে প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর একটি ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের ট্রানজিস্টার সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব।
তথাপি, ট্রানজিস্টারগুলো বর্তমানে এত ছোট হয়ে গিয়েছে যে এগুলোকে যদি আরও সঙ্কুচিত করা হয় তাহলে ঠিক ভাবে কাজ করবে না বলে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
আর তাই ইন্টেল ট্রানজিস্টারগুলোকে দুই মাত্রায় সঙ্কুচিত না করে প্রথমবারের মত ত্রিমাত্রিক ট্র্যানজিস্টর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন কম এনার্জি ব্যবহার করে পাবে আরও ভালো দক্ষতা। আর এই শক্তির প্রয়োজনীয়তা দিন দিন আরও কমতে থাকবে বলে ধারণা করছে ইন্টেল।
গ্রাফিক্স দক্ষতা:
কার্ক স্ক্যাজেন জানিয়েছেন যে সকল ব্যবহারকারী ইন্টিগ্রেটেড জিপিইউ ব্যবহার করেন তারা ভালো পারফরমেন্স লক্ষ্য করবেন। স্যান্ডি ব্রিজ চিপ অপেক্ষা প্রসেস ক্ষমতা বাড়ানোর কারণে এই চিপ নির্ভর ডিভাইসগুলো এখন আরও দক্ষতার সাথে হাই ডেফিনিশন ভিডিও সম্মেলন এবং ফোরকে (4k) রেজ্যুলেশনের ভিডিও চালাতে পারবে।
এছাড়া জিপিইউ ট্র্যান্সকোডিং হার বেড়ে যাবার ফলে ব্যবহারকারীরা আরও দ্রুত ভিডিও পুনরায় কোড করতে সক্ষম হবেন।
রয়েছে হার্ডওয়্যার নির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিল্ট-ইন ইউএসবি ৩.০ সমর্থন। ফলে পিসি যন্ত্রাংশ নির্মাতা আরও সস্তায় এই সুবিধাগুলো তাদের যন্ত্রাংশের সাথে যুক্ত করতে পারবে।
চিপ প্রতিযোগিতা:
ইন্টেলের এই সকল প্রচেষ্টা বর্তমানে চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এএমডির জন্য। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে তারা "রেজোনেন্ট ক্লক মেশ প্রযুক্তি" নামে নতুন একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের পাইলড্রাইভ চিপসেটের এনার্জি চাহিদা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই প্রযুক্তিতে প্রসেসরের ব্যবহৃত শক্তিকে পুনরায় ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছে তারা। তবে ঠিক কি ভাবে হবে এবং প্রসেসরগুলো কবে বের হবে তা পরবর্তীতে জানানো হবে বলে উল্লেখ করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা এএমডির চাইতে ইন্টেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে মনে করছে। তাদের মতে এএমডি ২০০০ সালে কিছু সময়ের জন্য ইন্টেলের চেয়ে এগিয়ে থাকলে তারপর থেকে ইন্টেল অনেক এগিয়ে গিয়েছে। ইউরোপের ডেভিস মারফি গ্রুপের প্রধান প্রযুক্তি বিশ্লেষক ক্রিস গ্রিন বলেন, "ইন্টেল প্রমাণিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে এগিয়ে চলেছে, আর এএমডি এক্ষেত্রে আঁকার বোর্ড উপাদান ব্যবহার করে এগিয়ে যাবার প্রচেষ্টা করছে। আর তাই এএমডি'র সফলতা সম্পর্কে সন্দেহও রয়েছে এবং পিসি নির্মাতারা তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাইবে কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে, বিশেষ করে প্রাথমিক অবস্থায়।"
তবে ইন্টেল কিন্তু এখানেই থেমে নেই, আইভি ব্রিজের উত্তরসূরি "হাসওয়েল" নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যে শুরু করে দিয়েছে তারা। স্ক্যাজেন জানান, এ ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য স্ট্যান্ডবাই, সবসময় চালু এবং সবসময় সংযুক্ত অবস্থায় ২০ গুণ ভালো ব্যাটারির স্থায়িত্ব। নতুন চিপটি ২০১৩ সালে বের হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সূত্র:বিবিসি








