বিটিআরসিতে সাড়ে তিন বছরের জিয়া আহমেদ: সাফল্যের ১০টি স্তম্ভ

(প্রিয় টেক) মে. জে. (অব.) জিয়া আহমেদ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার কাজ আমাদের মাঝে রয়ে গেছে, তার কাজের ফলাফল আমরা ভোগ করছি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর চেয়ারম্যান পদটি খুবই চ্যালেঞ্জিং, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জায়গায় যেখানে বহুমাত্রিক চাপের মুখে পড়তে হয় প্রতিদিন। সেই চাপকে সামাল দিয়ে ব্যালেন্স করে কাজ করতে পারেন খুব কম মানুষ। আমরা তার কাজের কিছু মূল্যায়ন তুলে দিচ্ছি আমাদের প্রিয় পাঠকদের জন্য। উল্লেখ্য, সাড়ে তিন বছরেরও বেশী সময় ধরে বিটিআরসি’র দায়িত্ব পালন করছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ।

১. আইটিইউ’র কাউন্সিলর
প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করে বিজয় পায় বাংলাদেশ। ২০১০ সালের অক্টেবরে মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ১৫৮ দেশের মধ্যে ১২৩ দেশের সমর্থন পেয়ে ষষ্ঠ স্থান পায় বাংলাদেশ। নির্বাচনে প্রতিবেশী পাকিস্তান এবং শ্রীলংকা পরাজিত হয়েছে বড় ব্যবধানে। এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল বিটিআরসি।
২. টু জি’র লাইসেন্স নবায়ন
গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি এবং সিটিসেলের দ্বিতীয় প্রজন্মের (টু জি) লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন জিয়া আহমেদ। লাইসেন্স নবায়নের নীতিমালা তৈরী করা থেকে শুরু হয় এর কাজ। পরে আগামী ১৫ বছরের জন্যে এই চার অপারেটরকে দেওয়া হয়েছে লাইসেন্স। গত ৭ আগষ্ট চার অপারেটরের কাছে হস্তান্তর করা হয় এই লাইসেন্স।
৩. সবচে বেশি রাজস্ব আয়
তার আমলেই বিটিআরসি সবেচ বেশি পরিমান টাকা সরকারী কোষাগারে জমা হয়। তিনি ঐকান্তিকভাবে চেষ্টা করেছিলেন, সরকারের রেভিনিউ যেন কোন অবস্থাতেই কমে যায়। এবং দেশ যেন তার যথাযোগ্য উপার্জন পায়। তিনি তরঙ্গ মূল্যের পরিমান যা ঠিক করেছিলেন, সেটা হয়নি বলে তিনি মন খারাপ করতেন। বলতেন, দেশের কোষাগারে আরো বেশি টাকা জমা হতো। কিন্তু বিভিন্ন লবি গ্রুপের কারণে সেই পরিমান ফি তিনি রাখতে পারেন নি।
৪. তরঙ্গ পুনর্বিন্যাস
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত ছিল এটি। গত ৩ মে রাত বারোটার পর মোবাইল ফোন অপারেটরদের ১৮’শ ব্যান্ডের তরঙ্গ পুনর্বিন্যাস করে বিটিআরসি। এই পুনর্বিন্যাসের ফলে বিটিআরসি ১৫ দশমিক ৬ মেগাহার্ডস তরঙ্গ বের করে আনতে পেরেছে। যার বাজার মূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বিটিআরসি এই তরঙ্গ প্রয়োজনে অন্য কোনো অপারেটরের কাছে বিক্রি করতে পারবে।
আগে ১৮’শ ব্যান্ডে গ্রামীণফোনের ১৪ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ছিল তিন জায়গায়। এখন এই পরিমান তরঙ্গ এক জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। একইভাবে রবিও তিনটি ভিন্ন স্থানে গ্রামীণফোনের সমপরিমান তরঙ্গ ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে আবার বাংলালিংক চারটি জায়গা থেকে কিছু কিছু মিলিয়ে ১২ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহার করত। এখন এগুলো সব একত্রিত করা হচ্ছে। ফলে গার্ড ব্যান্ড কমে গেছে। তাতে করে বাড়তি তরঙ্গ পাওয়া গেছে।

৫. অপারেটরদের অডিট
যদিও গ্রামীণফোনের অডিট কার্যক্রম নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে, কিন্তু তারপরেও এটি ঠিক যে আইনের থাকলেও গত দশ বছরে বিটিআরসি একবারের জন্যেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। জিয়া আহমেদ অন্তত এ বিষয়ে কার্যক্রম হাতে নেন। বিগত বিটিআরসি কেন টেলিকম কোম্পানীগুলোকে অডিট করেনি, এটা একটি বিশাল বিশ্ময়। এখানে সরকারের রিভিনিউ শেয়ারিং রয়েছে। তাই প্রতি অর্থ বছরেই সেটা অডিট করাটা জরুরী। কিন্তু সেই কাজটি জিয়া আহমেদ এসে শুরু করেছিলেন। এবং তিনি জোর দিয়ে বলতেন, গ্রামীনফোনের অডিট নিয়ে যে মামলা আছে, তাতে তিনি জিতবেন। এখন বাংলালিংক, রবি এবং সিটিসেলে অডিটের প্রক্রিয়া এখন শুরু হতে যাচ্ছে।
৬. দশ সেকেন্ডের পালস
যদিও টেলিটক ছাড়া আর কেউ এখনো এটি কার্যকর করেনি। কিন্তু তারপরেও এক্ষেত্রে তিনি অনেক দূর এগিয়েছিলেন। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সকল মোবাইল ফোন অপারেটরের এটি কার্যকর করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
মারা যাওয়ার আগেও কয়েকবার তিনি জানিয়েছেন, দশ সেকেন্ডের পালস কার্যকর করা গেলে এরপর প্রতি সেকেন্ডের পালসও তিনি কার্যকরার ব্যবস্থা করবেন। তবে সে পর্যন্ত আর দেখে যেতে পারলেন না তিনি।
৭. থ্রি জি লাইসেন্স
তৃতীয় প্রজন্মের (থ্রি জি) একটি খসড়া নীতিমালা তৈরী করে গত ২৭ মার্চ তা টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রনালয় না সেটি অনুমোদন করেছে, না তাতে কোনো কাজ করেছে। জিয়া আহমেদের করা নীতিমালায় বিদ্যমান অপারেটরগুলোর বাইরে আরো একটি নতুন অপারেটরকে সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়।
৮. ফেসবুকে প্রচারণা
জিয়া আহমেদের সর্ব শেষ কার্যক্রমগুলোর একটি ফেসবুক প্রচারণা। গত সপ্তাহে বিটিআরসি দেশের প্রথম কোনো সংস্থা হিসেবে ফেসবুকে অন্তর্ভূক্ত হয়। বিটিআরসি'র জন্য নতুন ফেসবুক পেজ খোলা হয়। ফেসবুকে তারা তাদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত জানানোর পর সেখান থেকে জনগনের ফিডব্যাকও নিতে শুরু করে।
এ বিষয়ে প্রিয় টেক একটি প্রতিবেদন তৈরীর প্রস্তুতি নিয়ে জিয়া আহমেদের সঙ্গে কথাও বলে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন তৈরী হওয়ার আগেই তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
৯. সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল
অন্যান্য দেশে থাকলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে আগে কেউ কখনো কিছু জানত না। জিয়া আহমেদ চারটি অপারেটরের লাইসেন্স নবায়নের সময় প্রথম এই বিষয়টি যুক্ত করেন। যেখানে বলা হয় অপারেটররা তাদের আয়ের এক শতাংশ এই তহবিলে দেবে। পরে তথ্য প্রযুক্তিসহ সংশ্লিষ্ট খাতের উন্নয়নের জন্যেই তা খরচ করবে সরকার। ইতিমধ্যে এই খাতের টাকা জমা পড়তে শুরু করেছে। তবে টাকা খরচের বিষয়ে তাদের তৈরী করা নীতিমালা এখনো অনুমোদন করেনি টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়।
১০. ভাস অপারেটর সৃষ্টির উদ্যোগ
দেশীয় অপারেটরদেরকে মোবাইলের ভ্যালু অ্যাডেড সেবায় নিয়ে আসার জন্যে এ বছরই প্রথম বিটিআরসি উদ্যোগ নেয়। তিনি মনে করতেন, ভ্যালু এডেড সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে নতুন ধরনের উদোক্তা তৈরী হবে। এবং মোবাইল ফোন অপারেটররা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ভাস সেবা উন্মুক্ত রাখবে, যেন যে কেউ এই কানেক্টিভিটি ব্যবহার করে নতুন নতুন সেবা নিয়ে আসতে পারে। সে বিষয়ে একটি নীতিমালাও তৈরী করে তারা। কিন্তু মন্ত্রনালয় সেটিও এখনো অনুমোদন করেনি।













