প্রতারণার জন্য বাংলালিংককে ১০ লাখ টাকা জরিমানা। গ্রাহকের ৯২ কোটি টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ। রবি-এয়ারটেলের বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসছে

(প্রিয় টেক) নানা ফন্দি-ফিকিরে গ্রাহক ঠকিয়ে অপারেটরদের পয়সা কামানোর বেশ কয়েকটি প্রমাণ পেয়েছে টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসি। সম্প্রতি দ্বিতীয় গ্রাহক সেরা অপারেটর বাংলালিংক এমন এক অফারের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে অন্তত ৯২ কোটি টাকা তোলে। এখন টপ-আপের মাধ্যমে পুরো টাকা গ্রাহককে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বিটিআরসি। একই সঙ্গে অপরাধের দন্ড হিসেবে জরিমানা করা হয়েছে দশ লাখ টাকা।

গত বুধবার এক কমিশন বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। এই বৈঠকেই আরো কয়েকটি অপারেটরের শাস্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, আইন বিরুদ্ধ মোবাইল সেট উপহার দেওয়ার দুটি অপারেটরকে একই রকম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তৃতীয় গ্রাহক সেরা অপারেটর রবি এবং এয়ারটেল বেশ কিছুদিন থেকে মোবাইল সেট উপহার দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছিল। আর সম্প্রতি বিজ্ঞাপন দিয়েছে রবি। এসব বিষয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয় থেকে বিটিআরসিকে এতোটা কঠোর না হতে অনুরোধ করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর ইফতারেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। তবে যেহেতু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়েছে ফলে সেখান থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে বিটিআরসি’র বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা।
অপারেটরগুলোর অপরাধ এবং বিটিআরসি’র জরিমানা সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ। তিনি বলেন, ভায়োলেশন এবং কমপ্লায়েন্স নিয়েই বিটিআরসি এখন বেশী কাজ করবে। গ্রাহক স্বার্থের দিকেই তাদের বেশী মনযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বছরের শুরুর দিকে বাংলালিংক একটি প্যাকেজ দেয় যেখানে দিনে চার টাকা দিলে ৬৫ পয়সা মিনিটে কথা বলা যাবে। বিটিআরসি এ বিষয়ে পরে বাংলালিংকের কাছে জানতে চায়। তারা জানিয়েছে, প্রতিদিন চার টাকা হারে ৯২ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। প্যাকেজটিতে বিটিআরসি’র অনুমোদন ছিল না বলেও বলা হচ্ছে। বিটিআরসি গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া এই অর্থের পুরোটাই আই-টপ-আপ হিসেবে ফেরত দিতে বলেছে। আর আগে বাংলালিংকেরই আইকন নামের একটি প্যাকেজও বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। তাছাড়া বর্তমানে বিভিন্ন কেনাকাটায় বিভিন্ন মাত্রায় কমিশনের ঘোষণা দেওয়া অপর একটি প্যাকেজ নিয়েও কাজ করছে বিটিআরসি।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলালিংকের পরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, বিটিআরসিকে তারা অনুরোধ করেছেন এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্যে। তারপরেও তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে তারা যদি এখান থেকে সরে না আসে তাহলে বিটিআরসি’র বিরুদ্ধে তারা মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
বেশ কিছুদিন থেকেই মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো অনুমোদনহীন অনেক কাজ করছে বলে বিটিআরসি নানা সূত্রে খবর পেয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই গ্রাহক নিবন্ধন নিশ্চিত করা, ভিওআইপি’র সঙ্গে অপারেটরদের সম্পৃক্ততা, প্রতারণা সম্পূর্ণ বন্ধ করাসহ গ্রাহক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করতে উদ্যোগ নেয় বিটিআরসি। অভিযোগ রয়েছে, বিটিআরসি’র কাছ থেকে কোনো রকম কোনো অনুমোদন না নিয়ে নানা প্যাকেজ বাজারে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ইচ্ছে মাফিক প্যাকেজ নির্ধারণ করছে অপারেটররা। বিটিআরসি বলছে, এসব বিষয়ে আর কোনো ছাড় নয়। সব কিছুর আগে গুনগত সেবা এবং গ্রাহক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব বিষয়ে সামনের দিনে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। আগামী রবি-সোমবারের মধ্যে এ বিষয়ে হুশিয়ারি বার্তাও পাবে কয়েকটি অপারেটর।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শুরু থেকেই মোবাইল ফোন অপারেটররা নানা কায়দাকানুন করে গ্রাহক ঠকাচ্ছে। সম্প্রতি বিটিআরসিকে পাশ-কাটিয়ে তারা অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু টু-জি লাইসেন্স নবায়ন এবং মামলা সংক্রান্ত জটিলতায় ব্যস্ত থাকায় এসব বিষয়ে এতোদিন তারা খুব একটা মনোযোগ দিতে পারেননি। কিন্তু এখন আর অপারেটররা ছাড় পাবে না। এখন নিয়ম কানুন প্রতিষ্ঠায় জিরো টলারেন্সে যেতে চাইছে বিটিআরসি।
জানা গেছে, অপারেটররা যাতে আইনের রকম ফাঁকফোকর গলিয়ে কোনো অন্যায় না করতে পারে তার জন্যে ট্যারিফ নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিটিআরসি দেখেছে, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অপারেটরা গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশী ঠকায়। অনেক সময় টাকা শেষ না হলেও মাস শেষ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে অব্যহৃত টাকা কেটে নেওয়া হয়। ট্যারিফ নীতিমালা নিয়ে কাজ করছেন এমন এক কর্মকর্তা প্রিয়.কম-কে বলছেন, অন্যায়ভাবে প্রতি মাসেই শত কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে অপারেটররা।
টক টাইমের বাইরে কোনো বাড়তি উপহার দেওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ আছে বিটিআরসি’র। কিন্তু কে মানে কার কথা? ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেওয়া অনুমোদনের মাধ্যমে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে একটি বিশেষ বিজ্ঞাপন দেয় রবি। ততে বলা হয়, প্রতি ঘন্টায় সবচেয়ে বেশী কথা বলবেন যে, তিনি জিতে নিতে পারবেন নকিয়ার আইওআই হ্যান্ডসেট। ২৮ জুলাই এক দিন বিজ্ঞাপনটি প্রচারের পরই বন্ধ করে দেয় তারা।
পরে এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে অপারেটরটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদুর রহমান জানান, ২০০৮ সালে এ বিষয়ে তাদের অনুমোদন নেওয়া আছে। অনুমোদনের বাইরে তারা কখনো কোনো অফার দেনি বলেও বলেন তিনি।
পরে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিটিআরসি’র এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৮ সালে এমন অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু ওই বছরের মাঝামাঝি সময়ে এই অপারেটরটিই কথার ‘ওপর গোল্ড কয়েন’ উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেয়। তারপরেই বিটিআরসি এমন অফার দেওয়া নিষিদ্ধ করে দেয়। ফলে আগের অনুমোদনও বাতিল হয়ে যায় বলে জানান তিনি।
বিটিআরসি বলছে, মোবাইলে কথা বলার পরিমানের ওপর ভিত্তি করে গ্রাহকদের প্লেনের টিকিট, ফ্ল্যাট, কম দামে বড় হোটেলে থাকা, ডিসকাউন্টে কেনাকাটাসহ নানা প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সকল শর্ত পূরণ করেও গ্রাহক বিজ্ঞাপনে ঘোষিত পুরষ্কার বা সকল সুবিধা পান না। এসব বিষয়ে তাদের কাছে অনেক অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে বিটিআরসি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিআরসি’র এক কর্মকর্তা প্রিয়.কম-কে বলেন, অপারেটররা যখন এমন অফার দেয় তার পর থেকে বিটিআরসিতে প্রচুর ফোন আসে। গ্রাহকরা একেকজন ফোন করে বলতে থাকে হাজার হাজার টাকার কথা বলালো কিন্তু কিছুই পাই নাই।
জানা গেছে, বেশ কিছুদিন আগে থেকেই হ্যান্ডসেট উপহার দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এয়ারটেল। বিটিআরসি বলছে, এক্ষেত্রে তাদের কোনো অনুমোদন নেই। পরে তাদের দেখা দেখি রবিও একই অফার দিয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছে বলে ধারণা করছে বিটিআরসি। এক্ষেত্রে বিটিআরসি বলছে, প্রয়োজনে টক টাইম ফ্রি দেওয়া যাবে। কিন্তু সেটিও দিতে হবে সবাইকে। ইচ্ছে মাফিক কোনো পুরষ্কার দেওয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই।
তবে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে অপারেটররা বারবার বেরিয়ে যাচ্ছে। সে কারণে এখন ট্যারিফ ডাইরেক্টিভস নতুন করে তৈরী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, ইন্টারনেটের ওপর সবচেয়ে বেশী উল্টা-পাল্টা করে অপারেটররা। কেউ নির্দিষ্ট পরিমান ব্যান্ডউইথ কেনার পরেও ব্যবহার না হলে তার পুরোটাই নিয়ে নেয় অপারেটররা। এখানে অব্যবহৃত অংশ এভাবে ফরফিট করা যাবে না বলে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিটিআরসি। এসব বিষয়ে কয়েকটি অপারটরকে শোকজ করা হবে বলে জানিয়েছে সূত্র।
এসব বিষয়ে কোনো অপারেটরের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি অপারেটরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু বিটিআরসি অনিচ্ছায় লাইসেন্স দিতে বাধ্য হয়েছে, সে কারণে সামনে অডিটসহ অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে তাদের। এ বিষয়ে তারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন বলেও জানান তিনি।













