অর্থসংকটে ৪ মোবাইল পরিচালক

priyodesk's picture

(প্রিয় টেক) মোবাইল ফোন পরিচালকদের টুজি (দ্বিতীয় প্রজন্ম) লাইসেন্স নবায়নে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ পরিশোধের আজ শেষ দিন। তবে সংকটের কারণে বেঁধে দেয়া সময়ে অর্থ জমা দিতে পারছে না নবায়নের অপেক্ষায় থাকা চার অপারেটরের কেউই। বিষয়টি জানিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও সিটিসেল। তবে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হলেও আজ এ ব্যাপারে বিটিআরসি সিদ্ধান্ত দেবে বলে জানা গেছে। বিটিআরসি সময় বাড়াবে বলে আশাবাদী মোবাইল ফোন অপারেটররা।

গত ২৪ জুলাই টুজি লাইসেন্স নবায়ন ও তরঙ্গ বরাদ্দ ফির দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ চেয়ে চার অপারেটরকে চিঠি দেয় বিটিআরসি। মোট পাওনার ২৯ শতাংশ হিসাবে দ্বিতীয় কিস্তিতে গ্রামীণফোনকে ১ হাজার ৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা জমা দিতে বলেছে বিটিআরসি। এর সঙ্গে আগের পাওনা ও বিলম্ব ফি মিলিয়ে আরও ৪৭১ কোটি ৫৮ লাখসহ মোট ১ হাজার ৫২২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দিতে বলা হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় এ সেলফোন অপারেটরকে। দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ, বকেয়া পাওনা ও বিলম্ব ফিসহ বাংলালিংককে ৭৭২ কোটি ৫১ লাখ, রবিকে ৭২৭ কোটি ৮৯ লাখ ও সিটিসেলকে ১৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।


অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক বৈঠকে চলতি মাসের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার আলোকে দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ পরিশোধে আরও এক মাস সময় বাড়ানো হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে সময় বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিটিআরসি। বিটিআরসির একটি সূত্র জানায়, দ্বিতীয় কিস্তিতে যে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা পাওয়া যাবে, তা থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৭ কোটি টাকা সুদ বাবদ আয় হবে সরকারের। সময় বাড়ানো হলে সরকার এ আয় থেকে বঞ্চিত হবে।

এ প্রসঙ্গে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ বলেন, লাইসেন্স নবায়নে কিস্তির অর্থ পরিশোধের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। লাইসেন্সিং নীতিমালায় তা বলাও আছে। সে অনুযায়ী তাদের কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে।

সময় বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না? এমন প্রশ্নে জিয়া আহমেদ জানান, বিটিআরসির সময় বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। নির্ধারিত তারিখে অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে নিয়ম অনুযায়ী মূল টাকার সঙ্গে সুদসহ জমা দিতে হবে তাদের।

এ প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা কাজী মনিরুল কবির বলেন, সব অপারেটরই সময় বাড়ানোর জন্য বিটিআরসির কাছে আবেদন করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল সংকটে রয়েছে। লাইসেন্স না থাকায় দেশী-বিদেশী কোনো উৎস থেকেই তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। চার প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে এ আবেদন করেছে।

দেশের ছয় সেলফোন অপারেটরের মধ্যে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও সিটিসেলের টুজি লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের নভেম্বরে। সে সময় লাইসেন্স নবায়নে প্রথম কিস্তির ৪৯ শতাংশ হিসাবে ৩ হাজার ১৮৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা জমা দেয় অপারেটররা। এর মধ্যে গ্রামীণফোন ১ হাজার ৩৪৮ কোটি ৪৬ লাখ, বাংলালিংক ৮২৯ কোটি ৬৭ লাখ, রবি ৮০০ কোটি ১৮ লাখ ও সিটিসেল ১৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা জমা দেয়। তবে নবায়নসংক্রান্ত নানা ধরনের জটিলতার রেশ ধরে এখনো লাইসেন্স ছাড়াই চলছে এ চার অপারেটরের সেবা। এখন দ্বিতীয় কিস্তি হিসেবে মোট অর্থের ২৯ শতাংশ দিতে হবে তাদের। শেষ কিস্তির ২২ শতাংশ দিতে হবে আগামী বছর।

এর আগে মোট চার কিস্তিতে লাইসেন্স নবায়নের সুযোগ ছিল। প্রথম কিস্তিতে ৪৯ শতাংশ দেয়ার পর তিন কিস্তিতে ১৭ শতাংশ করে পরিশোধ করার বিধান ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মন্ত্রণালয় চার কিস্তির পরিবর্তে তিন কিস্তির নিয়ম করে। সে অনুযায়ী, প্রথম কিস্তির ছয় মাস পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং দ্বিতীয় কিস্তির এক বছর পর শেষ কিস্তির অর্থ জমা দিতে হবে অপারেটরদের।

গ্রামীণফোনের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান মাহমুদ হোসাইন জানান, তারা টাকা জমা দেয়ার সময় বাড়াতে বিটিআরসিতে আবেদন করেছেন। সে ক্ষেত্রে তাদের আগে লাইসেন্স দেয়ারও অনুরোধ করা হয়েছে। একই কথা বলেছেন বাংলালিংকের করপোরেট বিভাগের পরিচালক জাকিউল ইসলাম। তিনি জানান, বিটিআরসি তাদের লাইসেন্স নবায়ন করে দিলে তারা সব পাওনাই পরিশোধ করে দেবেন। সেটা আদালতের আদেশেও হতে পারে, আলোচনার মাধ্যমেও হতে পারে।

রবির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহমুদুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, সময় বাড়ানোর জন্য বিটিআরসির কাছে আবেদন করা হয়েছে। আবেদন মঞ্জুর হয়েছে কি না এখনো তা জানানো হয়নি। অর্থসংস্থান করতে না পারায় কিস্তির অর্থ এখনই দিতে পারছে না রবি।

সিটিসেলের হেড অব কর্পোরেট কমিউনিকেশনস অ্যান্ড পিআর তাসলিম আহমেদও অর্থসংকটের কথা উল্লেখ করে কিস্তির অর্থ প্রদানে অপারগতার কথা জানান।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর লাইসেন্স নবায়নের চূড়ান্ত নীতিমালা প্রকাশ করে বিটিআরসি। নীতিমালা অনুযায়ী গত ১১ অক্টোবরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সেলফোন অপারেটরদের লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করতে বলা হয়।

৯ অক্টোবর বাংলালিংক লাইসেন্স নবায়নের আবেদন জমা দেয়। ১০ অক্টোবর আবেদন জমা দেয় গ্রামীণফোন, রবি ও সিটিসেল।

নীতিমালা অনুযায়ী, মার্কেট কম্পিটিশন ফ্যাক্টর (এমসিএফ) পদ্ধতিতে গ্রামীণফোনের জন্য ১ দশমিক ৪৮, বাংলালিংকের ১ দশমিক শূন্য ৬, রবির দশমিক ৯৯ ও সিটিসেলের জন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ তরঙ্গ মূল্য ধার্য করা হয়েছে। এতে গ্রামীণফোনকে ১৪ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গের জন্য মোট ৩ হাজার ২৪১ কোটি ২০ লাখ, ১২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গের জন্য বাংলালিংককে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৬০ লাখ, ১২ দশমিক ৮ মেগাহার্টজ তরঙ্গের জন্য রবিকে ১ হাজার ৯০০ কোটি ৮০ লাখ এবং ৮০০ ব্যান্ডের ১০ মেগাহার্টজ তরঙ্গের জন্য সিটিসেলকে ৪৫০ কোটি টাকা দিতে হবে।

বিটিআরসির দাবি অনুযায়ী, লাইসেন্স নবায়নের প্রথম কিস্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠানগুলোর ৩ হাজার ৯৬৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা জমা দেয়ার কথা। তবে অপারেটররা ভ্যাট ও এমসিএফ বাবদ ৭৮৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা কেটে রাখে। এর মধ্যে চার প্রতিষ্ঠান শুধু ভ্যাট বাবদ কেটে রাখে ৫৬১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ভ্যাট বাবদ গ্রামীণফোন ২৩৯, রবি ১৪১, বাংলালিংক ১৪৬ ও সিটিসেল ৩৪ কোটি টাকা কম দিয়েছে। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে আদালতে যায় অপারেটররা।

সৌজন্যে: বণিক বার্তা ও ইত্তেফাক