মোবাইল ফোন পরিচালক বনাম বিটিআরসি: বিরোধ নিরসনের তত্ত্ব-তালাশ

(প্রিয় টেক) টুজি লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সেলফোন অপারেটরদের মধ্যে বছর খানেক ধরেই এক ধরনের টানাপড়েন চলছে। ভ্যাট বাবদ অপারেটরদের কাছে অর্থ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে একপর্যায়ে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। দুই পক্ষের মধ্যকার এ বিরোধ নিরসনে সম্প্রতি জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। এতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নেমেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, পাওনা পরিশোধ হলেই সেলফোন অপারেটরদের টুজি লাইসেন্স নবায়ন করা হবে। আর অপারেটরদের বক্তব্য , ভ্যাটের অর্থ দিতে হবে না, এমন নিশ্চয়তা পেলে বিটিআরসির বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নেয়া হবে।
এ বিরোধ সমাধানের উপায় খুঁজতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিটিআরসি ও সেলফোন অপারেটরদের নিয়ে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এতে উপস্থিত ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো গেছে। আদালতে লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। এতে সব পক্ষই সম্মত হয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের পর আগস্টের মধ্যেই লাইসেন্স নবায়ন করা হবে। লাইসেন্স নবায়ন করতে না পারায় অপারেটররা নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছে না। এ জন্য তারা টুজি লাইসেন্সের দ্রুত নবায়ন চায়।
জানা গেছে, শর্তসাপেক্ষে লাইসেন্স নবায়নে রাজি হয়েছে বিটিআরসি। সমঝোতার ভিত্তিতে মামলা তুলে নিতেও সম্মত অপারেটররা। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বিটিআরসি অপারেটরদের লাইসেন্স নবায়নে আগ্রহী। এ জন্য তাদের কাছে যে পাওনা দাবি করা হয়েছে, তা পরিশোধ করতে হবে। অর্থ পরিশোধ হলে লাইসেন্স দিতে আপত্তি নেই বিটিআরসির।
এ বিষয়ে গ্রামীণফোনের হেড অব কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘ভ্যাট হিসেবে দাবি করা অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ অর্থ দিতে হবে না, এ নিশ্চয়তা পেলেই আমরা মামলা তুলে নেব। এখন এ অর্থ দিতে হলে কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অপারেটরদের ১৫ শতাংশ অর্থ ছাড় দিতে হবে। তা না হলে অপারেটররা মামলা কেন প্রত্যাহার করবে? ভ্যাট হিসেবে চাওয়া অতিরিক্ত অর্থ যেন দিতে না হয়, এ জন্যই তো আদালতে যাওয়া।’
গত বছরের নভেম্বরে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি ও সিটিসেলের টুজি লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়। এ সময় থেকে লাইসেন্স নবায়ন নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে এ চার অপারেটর। বিষয়টি নিষ্পত্তিতে আদালতের দ্বারস্থ হয় অপারেটররা। এখনো বিষয়টি বিচারাধীন। বিটিআরসির দাবি করা ভ্যাট ও মার্কেট কম্পিটিশন ফ্যাক্টর (এমসিএফ) নিয়ে মামলা করেছে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবি।
গ্রামীণফোনের করা মামলায় এরই মধ্যে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এতে ভ্যাটের বিষয়ে বিটিআরসির পক্ষে এবং এমসিএফের বিষয়ে গ্রামীণফোনের পক্ষে রায় দিয়েছেন আদালত। একই বিষয়ে বাংলালিংকের মামলার শুনানি শেষ হয়েছে। আগামী ২ আগস্ট এ মামলার রায় হবে। রবির মামলা এখনো বিচারাধীন। বর্তমানে বিটিআরসির অন্তর্বর্তীকালীন অনুমোদনের মাধ্যমে এ চার অপারেটর কার্যক্রম চালাচ্ছে।
জানা গেছে, লাইসেন্স নবায়নে মোট অর্থের ৪৯ শতাংশ হিসেবে প্রথম কিস্তিতে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ১৮৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা জমা দিয়েছে অপারেটররা। এর মধ্যে গ্রামীণফোন ১ হাজার ৩৪৮ কোটি ৪৬ লাখ, বাংলালিংক ৮২৯ কোটি ৬৭ লাখ, রবি ৮০০ কোটি ১৮ লাখ ও সিটিসেল ১৯৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা দিয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি অনুযায়ী, প্রথম কিস্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ৩ হাজার ৯৬৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা জমা দেয়ার কথা। অপারেটররা বিটিআরসিকে দেয়া লাইসেন্স নবায়ন ফি থেকে ভ্যাট ও এমসিএফ বাবদ ৭৮৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা কেটে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ভ্যাট বাবদ ৫৬১ কোটি ৯২ লাখ টাকা কম জমা দিয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোন ২৩৯ কোটি, রবি ১৪১, বাংলালিংক ১৪৬ ও সিটিসেল ৩৪ কোটি টাকা কম দিয়েছে বলে বিটিআরসির দাবি। এ নিয়েই আদালতে গেছে অপারেটররা।
বিনিয়োগ বাড়াতে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সচল রাখতে টুজি লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে দ্রুত সমাধান চায় অপারেটররা। এ প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা কাজী মনিরুল কবির বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে লাইসেন্স নবায়নের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে অপারেটররা। যত শিগগির সম্ভব লাইসেন্স নবায়ন চায় সব অপারেটর। লাইসেন্স না থাকায় তাদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভ্যাট ও এমসিএফ বিষয়ে উচ্চ আদালত যে আদেশ দেবেন, গ্রামীণফোন তা পালন করবে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার টুজি লাইসেন্স নবায়ন ফি ও তরঙ্গ বরাদ্দ ফির দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ চেয়ে চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি। মোট পাওনার ২৯ শতাংশ হিসেবে দ্বিতীয় কিস্তিতে গ্রামীণফোনকে ১ হাজার ৫০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা দিতে বলা হয়েছে। এর সঙ্গে আগের পাওনা ও বিলম্ব ফি মিলিয়ে আরও ৪৭১ কোটি ৫৮ লাখসহ মোট ১ হাজার ৫২২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা দিতে হবে তাদের। দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ, বকেয়া পাওনা ও বিলম্ব ফিসহ বাংলালিংককে মোট ৭৭২ কোটি ৫১ লাখ, রবিকে ৭২৭ কোটি ৮৯ লাখ ও সিটিসেলকে ১৬৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা দিতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলালিংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এমসিএফ ও ভ্যাটের বিষয়ে লাইসেন্স নবায়ন আটকে আছে। ভ্যাট কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সে ব্যাপারে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এমসিএফ ও ভ্যাট ছাড়া আপাতত লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনুরোধ করা হয়েছে। ভ্যাটের বিষয়ে কোনো সমাধান সম্ভব হলে এমনিতেই মামলার মীমাংসা হয়ে যাবে। সরকারের নির্দেশনা অনুসারে বিটিআরসি এ অর্থ চাইতে পারে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে অপারেটরদের ছাড় পাওয়ার বিষয়টিও পরিষ্কার করতে হবে।.
এ প্রসঙ্গে লাইসেন্স নবায়নের অপেক্ষায় থাকা রবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মহিউদ্দিন বাবর বলেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় কর্তৃপক্ষের আশ্বাস পেলে সম্মানজনক সমাধান সম্ভব হবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনগত যে কাগজপত্র (লাইসেন্স) প্রয়োজন, বর্তমানে তা নেই এ চার অপারেটরের।
সৌজন্যে:সুমন আফসার, বণিক বার্তা










