বাংলাদেশের মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক নিয়ে ভোগান্তি

PriyoTech's picture

(প্রিয় টেক) মোবাইল ফোনে কলড্রপ ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে গেছে। দফায় দফায় চেষ্টা করেও সংযোগ মেলে না। একটি সংযোগ পেতে কয়েকবার শুনতে হয়, 'দ্য মোবাইল ক্যান নট বি রিচড অ্যাট দিস মোমেন্ট'। মোবাইল স্ক্রিনে নেটওয়ার্ক এররও দেখায় অনেক সময়। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ককেন্দ্রিক এ ধরনের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সংসদেও এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ আলোচনা হয়েছে। সিনিয়র এমপিদের পাশাপাশি স্পিকার নিজেও নেটওয়ার্ক বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই অপারেটরের দুই গ্রাহকের মধ্যে যোগাযোগে সমস্যা যতটা, ভিন্ন অপারেটরের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি। আবার মোবাইল ফোন থেকে ল্যান্ডফোনে সংযোগ পেতেও ভোগান্তি পোহাতে হয় গ্রাহককে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি কোয়ালিটি অব সার্ভিস নিশ্চিতকরণের কাজ শুরু করেও থেমে গেছে। এ অবস্থায় তাদের বক্তব্যও গ্রাহকদের খুব বেশি আশ্বস্ত করতে পারছে না।

মোবাইল ফোন অপারেটররা যে যার নেটওয়ার্ক সেরা বলে দাবি করছে। এ ক্ষেত্রে ছোট অপারেটররা বলছে, সমস্যা মূলত বেশি গ্রাহকের অপারেটরগুলোয়। ক্ষমতার চেয়েও বেশি গ্রাহকের কারণে নেটওয়ার্ক বেশিরভাগ সময় ব্যস্ত থাকে, ফলে গ্রাহক সংযোগ পান না বা সংযোগ পেলেও অহরহ কলড্রপ হয়। বড় অপারেটর বলছে, নেটওয়ার্কের বিবেচনায় গত ১৫ বছরে সেরা অবস্থানে আছে তারা।

একাধিক গ্রাহক বিভিন্ন অপারেটরের নাম উল্লেখ করেই সরাসরি অভিযোগ করেন। তারা বলেন, অপারেটররা গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

এর আগে ঢাকার বাইরে সমস্যা হলেও এখন ঢাকায় সমস্যা বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি অপারেটরেরই এখন রাজধানীতে অসংখ্য পকেট তৈরি হয়েছে, যেখানে মোবাইল সিগন্যাল অত্যন্ত দুর্বল থাকে। অনেক ক্ষেত্রে উঁচু ভবনের ওপরের দিকে বা ভবনের পাদদেশেও নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। অপারেটরগুলো নেটওয়ার্ক দুর্বলতার জন্য গরম এবং বৃষ্টিকে সমানভাবে দায়ী করায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

গ্রামীণফোনের সার্ভিস অপারেশন সেন্টারের ম্যানেজার মনোয়ার শিকদার সমকালকে বলেন, শীতকালে নেটওয়ার্ক অন্য সময়ের তুলনায় ভালো থাকে। গরম বাড়লে বা বৃষ্টিতেও অনেক ক্ষেত্রে রেডিও নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, সামান্য বাতাসেও অনেক সময় রেডিও নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়। তখন গ্রাহক দুর্বল সংযোগ পান। মনোয়ার শিকদার অবশ্য দাবি করেন, সার্ভিস লেভেলের সর্বোচ্চ সেবা দিচ্ছে গ্রামীণফোন।

দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে নেটওয়ার্ক সোয়াপের (প্রতিস্থাপন) কাজ করছে ৪ কোটি গ্রাহকের অপারেটর গ্রামীণফোন। সোয়াপের শুরু থেকে তাদের নেটওয়ার্কে যে বিভ্রাট তৈরি হয়েছে তা শেষ হয়নি। অবশ্য সোয়াপের কাজ শেষে সবুজ বাতির সংকেত সংবলিত বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে। গ্রামীণফোন দাবি করছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে তাদের নেটওয়ার্কই এখন সবচেয়ে ভালো। এরপরও রাজধানীতে গ্রামীণফোনের কয়েকটি ব্ল্যাক স্পট এবং দুর্বল নেটওয়ার্কের পকেট থাকার কথা স্বীকার করেন মনোয়ার। বর্তমানে উত্তরা এবং পুরান ঢাকায় কিছু সমস্যা রয়েছে বলে সমকালকে জানান তিনি।

বর্তমানে উত্তরা এলাকায় সমস্যা বেশি হচ্ছে বলেও জানান দ্বিতীয় গ্রাহকসেরা অপারেটর বাংলালিংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা বলেন, উত্তরা এলাকায় একসময় ছয়তলার বেশি উঁচু ভবন ছিল না। নেটওয়ার্ক কাঠামোও তৈরি হয়েছিল সেই বিবেচনায়। এখন অনেক উঁচু ভবন ওই এলাকায় হচ্ছে। ফলে নেটওয়ার্ক পেতে সমস্যা হচ্ছে।

গ্রাহকদের বক্তব্য অনুসারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি নেটওয়ার্ক সমস্যা হচ্ছে নতুন অপারেটর এয়ারটেলে। কম কল রেটের কারণে অনেক নতুন গ্রাহক এ অপারেটরের দিকে ঝুঁকলেও নেটওয়ার্ক সমস্যা তাদের ভোগাচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। একজন অবশ্য বলেন, আবহাওয়ার তারতম্যই বড় সমস্যা করছে। অন্য একজন বলেন, নিজেরা নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার কাজ না করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করাতে গিয়ে সমস্যা হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটককে নিয়েও অভিযোগের অন্ত নেই। ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের দাবি, টেলিটকের জন্মের পর থেকে এখনকার নেটওয়ার্কই সবচেয়ে শক্তিশালী। আগে খাপছাড়াভাবে ইচ্ছামতো বিটিএস বসানো হলেও এখন পরিকল্পনামাফিক কাজ করা হচ্ছে। গত তিন বছরে ঢাকায় নতুন ১৫০ বিটিএস বসেছে। সবমিলিয়ে ঢাকাতেই বিটিএস ৪০০ পেরিয়ে গেছে বলে জানান তিনি। মুজিবুর রহমান বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে রাজধানীতে আরও প্রায় ১৫০ বিটিএস যোগ হবে। এ ছাড়া ঢাকায় এখন যেসব পকেটে সমস্যা রয়েছে বা যেখানে বিভিন্ন উৎসবে লোকসমাগম বেশি হয় সেখানকার শক্তি বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে রবির নেটওয়ার্ক নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের তালিকা থেকে বাদ পড়েনি সিটিসেলও। নেটওয়ার্ক বিষয়ে সিটিসেলের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্য হলো, যতটুকু এলাকায় নেটওয়ার্ক আছে সেটুকুতে সর্বোচ্চ গুণগত মান নিশ্চিত করা। রবির চিফ টেকনিক্যাল অফিসার একেএম মোরশেদসহ তাদের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

সমস্যা বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) জিয়া আহমেদ বলেন, গ্রাহক যেন সেরা সেবা পান সে জন্য কোয়ালিটি অব সার্ভিস বাস্তবায়নের কাজ হচ্ছে। এ সংক্রান্ত কিছু কাজ এগোলেও পুরোটা বাস্তবায়ন শেষ হয়নি বলেও জানান তিনি। মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি কার্যকর হলে আগের নম্বর ঠিক রেখেই গ্রাহক যখন-তখন বাজে নেটওয়ার্ক ছেড়ে ভালো নেটওয়ার্কের অপারেটরে যেতে পারবেন। তখন নেটওয়ার্কের প্রতি অপারেটররা আরও মনোযোগী হবে বলে দাবি করেন তিনি।

সৌজন্যে: সমকাল