গ্রামীণফোনের আয় বাড়লেও কমেছে লাভ। মার্কেট শেয়ার, গ্রাহক প্রতি আয় ও গ্রাহক প্রতি ব্যবহারে ভাটার টান

(প্রিয় টেক) দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের মোট আয় বেড়েছে। কিন্তু কমে গেছে নেট লাভ এবং শেয়ার প্রতি আয়। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) তথ্য বিশ্লেষণে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। একই সঙ্গে তাদের গ্রাহক বৃদ্ধির হার কমেছে, কমেছে মার্কেট শেয়ার, গ্রাহক প্রতি আয় এবং নেটওয়ার্কে বিনিয়োগও। তবে ইন্টারনেট ডাটা ব্যবহারের পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে।
আজ মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার একটি হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিন মাসের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে গ্রামীণফোন। তবে ওই সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণফোনের পুরো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। গ্রামীণফোনের মূল কোম্পানি নরওয়ের টেলিনর গ্রুপের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত আরো তথ্য পাওয়া গেছে। সে সব তথ্য বিশ্লেষণে কোম্পানিটি সম্পর্কে আরো মজার তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
আয় বেড়েছে, লাভ কমেছে
জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে গ্রামীণফোন ২,৩২২ কোটি টাকা আয় করে। আগের বছরের ঠিক একই সময়ে তাদের আয় ছিল ২,০৬৭ কোটি টাকা। ওই সময়ের তুলনায় এই আয় ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে টেলিনরের অন্য যে ১১টি দেশে সেবা কার্যক্রম রয়েছে সেখানকার সামগ্রিক হিসেবে দেখা গেছে তাদের রেভিনিউ আয় বেড়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। সেই হিসেবে বাংলাদেশেই বরং তারা অনেক ভালো করেছে।
তবে সর্বশেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলায় গ্রামীণফোনের আয় বেড়েছে মাত্র ১.৭ শতাংশ। তার আগের প্রান্তিকেও আয়ের অংক সমান ২,২৮৩ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়।
আয়ের ঘর বেশ সমৃদ্ধ দেখালেও এই সময়ে গ্রামীণফোনের লাভের অংক কমে গেছে। জানুয়ারি-মার্চে তাদের নেট লাভের পরিমান ৫২০ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তাদের লাভ ছিল মাত্র ২৮৭ কোটি টাকা। এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে গ্রামীণফোন ২২ শতাংশ নেট লাভ করেছে বলে ঘোষণা করেছে। তবে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে তাদের নেট লাভ ছিল ৬৪৯ কোটি টাকা। সে সময় তাদের ২৮ শতাংশ ভাল ছিল।
লাভ কমলেও এই অংকেই গ্রামীণফোন সন্তুষ্ঠু বলে জানায়। একই সঙ্গে লাভ কমার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা জানায়, টাকার অবমূল্যায়ণ এবং বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে ধারাবাহিক আয়েও লাভের অংক কমেছে। আর আয় বাড়ার ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে মূলত গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধির এবং ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নন ভয়েস সেবা, রোমিংয়েও তাদের আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে।
গ্রাহক প্রতি আয় কমেছে
গ্রাহক প্রতি আয়ের ক্ষেত্রে গ্রামীণফোন কোনো তথ্য মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেনি। তবে টেলিনরের ওয়েব সাইটে বলা হয়েছে, আগের প্রান্তিকের তুলনায় গ্রাহক প্রতি আয় ৬ শতাংশ কমেছে। এক্ষেত্রে তারা ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারকেই দায়ী করেন।
তবে গ্রাফিক্সে দেখানো হয়েছে, গ্রামীণফোনের গ্রাহক প্রতি আয় (আরপিইউ) এখন মাসে ২০৩ টাকা। এক বছর আগে এটি ছিল ২১৬ টাকা। মাঝে গত বছরের শেষ তিনটি প্রান্তিকে এই আয় ছিল যথাত্রক্রমে ২২৩, ২১৩ এবং ২০৬ টাকা।
কমেছে গড় ব্যবহার
গ্রাহকের মাসে গড় ব্যবহার (এএমপিইউ) সম্পর্কেও কোনো তথ্য দেয়নি গ্রামীণফোন। তাদের প্রতিবেদনেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। তবে টেলিনরের ওয়েব সাইটে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গ্রামীণফোনের গ্রাহকদের গড় মোবাইল ফোন ব্যবহারের হারও আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় কমেছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে একজন গ্রাহক মাসে গড়ে ২৪১ মিনিট মোবাইলে কথা বলেছেন। ২০১১ সালের জানুয়ারি-মার্চে এর পরিমান ছিল ২৬৩ মিনিট। পরের তিনিটি প্রান্তিকে এই অংকগুলো দাঁড়ায় ২৭০ মিনিট, ২৫৭ মিনিট ও ২৪৪ মিনিট।
গ্রাহক প্রবৃদ্ধি আর মার্কেট শেয়ার কমেছে
শেষ হওয়া জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ১১ লাখ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে গ্রাহক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাদের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ২০১১ সালের প্রথম প্রান্তিকে তাদের গ্রাহক বেড়েছিল ২০ লাখ। পরের প্রান্তিকেও সমপরিমান গ্রাহক বৃদ্ধি পায়। মাঝখানে গত বছরের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে গ্রাহক বৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ১৮ লাখ, ১৪ লাখ ও ১৩ লাখ।
গত বছর বাজেটে সিম প্রতি ট্যাক্স ৮’শ টাকা থেকে কমিটিয়ে ৬’শ টাকা করা হলেও গ্রাহক বৃদ্ধির প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের সিইও টোরে জনসন বলেন, চাইলেই তারা গ্রাহক বৃদ্ধি করতে পারেন। কিন্তু তাতে সাবসিডি অনেক বেশী লাগবে। সে কারণে অহেতুক গ্রাহক বাড়ানোর পক্ষে নন তারা।
অন্যদিকে টেলিনরের সব কোম্পানি মিলিয়ে এই প্রান্তিকে নতুন গ্রাহক যোগ হয়েছে ৫৬ লাখ। এর মধ্যে গ্রামীণফোন একাই যোগ করেছে ১১ লাখ বা এক পঞ্চমাংশ।
গ্রাহক বাড়লেও দেশের মোট মোবাইল ব্যবহারকারীর শতাংশের বিচারে গ্রামীণফোন কিছুটা হলেও পিছিয়ে গেছে। এক বছর আগে তাদের মার্কেট শেয়ার ছিল ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এক হাজার জনের মধ্যে ৪৩৮ জন গ্রামীণফোনের ব্যবহারকারীর সেই হিসেবে এখন নেমে এসেছে ৪২১ জনে।
ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে
সামগ্রিকভাবে গ্রাহক তেমন একটা না বাড়লেও গ্রামীণফোনের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারীর সংখ্যা ৫৮ লাখ ৪০ হাজার পেরিয়ে গেছে। এক বছর আগেও তাদের সিমে ইন্টারনেট ব্যবহারকারির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৪ লাখ।
নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ কমেছে
প্রথম প্রান্তিকে নেটওয়ার্কের পেছনে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৩৭৩ কোটি টাকা। তবে অক্টোবর-ডিসেম্বরে এর পরিমান ছিল ২৯৬ কোটি। এর আগে জুলাই-সেপ্টেম্বরে এর পরিমান ছিল ৪৪৯ কোটি টাকা।
টু জি নবায়নের আগে থ্রি জি নয়
সংবাদ সম্মেলনে এক পর্যায়ে টোরে জনসন বলেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের (টু জি) মোবাইল ফোনের লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগে তৃতীয় প্রজন্মের (থ্রি জি) লাইসেন্স সংক্রান্ত আলোচনায় গ্রামীণফোন আগ্রহী নয়। একই সঙ্গে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিসের বিষয়েও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন আছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে টেলিনরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে টু-জি লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কয়েক প্যারা মন্তব্য করা হয়।
আজ গ্রামীণফোনের শেয়ার দাম কমেছে টাকা ৪.৭০ (শতকরা ২.২ ভাগ)।














