আউটসোর্সিংয়ে মেয়েরা

(প্রিয় টেক) গতানুগতিক পেশাকে ছাড়িয়ে মেয়েরা বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কাজ করছে এবং আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করছে। এমন একটি যুগোপযোগী পেশা আউটসোর্সিং। অনলাইনে আয়। কিছুদিন আগেও আমরা এ বিষয়টিতে অজ্ঞ ছিলাম। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে সহজ পদ্ধতিতে কম সময়ে আয়ের পথ সম্পর্কে না জানাটা নেহাৎ বোকামি।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশে পুরুষের থেকে নারীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশি। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়লেও কমেছে কর্মসংস্থান। প্রতি বছর লাখ লাখ ছেলেমেয়ে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে যুদ্ধ করছেন। যারা চাকরি পান না তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আবার মেয়েদের কিছু অংশ পড়াশোনার মাঝপথে বিয়ের পরে ঝরে যায়। শিক্ষিত হয়েও অনেকে অর্থ উপার্জন করতে পারছেন না সুযোগের অভাবে এবং সংসার-ধর্ম পালনের কারণে। অথচ একটু সচেতন হলে তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান ধারণ করতে পারলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারেন যে কোনো বয়সের মেয়ে।

অনলাইনে যে ধরনের কাজ করা যায় তা হলো ডাটা এন্ট্রি, ব্লগ রাইটিং, সার্চিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব পেইজ ডিজাইন, মাইক্রো ওয়ার্কস, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি। মেয়েরা ঘরে বসে কোনো রকম বিড়ম্বনা ছাড়াই আয় করতে পারেন। তুলনামূলক এখনও ছেলেদের থেকে মেয়েদের সংখ্যা কম। এ বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বেশকিছু ট্রেনিং সেন্টার চালু হয়েছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান বিআইডিডি, যারা ৪ বছর ধরে প্রচুর ছেলেমেয়েকে অনলাইনে আয়ের পদ্ধতিগুলোর ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে।
আউটসোর্সিং কাজে নিয়োজিত আয়েশার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জানার আগ্রহ থেকেই আউটসোর্সিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেওয়া, পরে মনে হলো শিখলাম যেহেতু সেটাকে প্রয়োগ করা উচিত। এখন আমি যতটুকু আয় করছি তা দিয়ে আমার হাত খরচ চলে যায়। আয়েশা বললেন,বদরুন্নেসা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ছি, অল্প বয়সে উপার্জন করতে পারায় আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। বর্তমানে আমি ফ্রিল্যান্সিং করছি। এ পর্যন্ত মাসিক সর্বনিম্ন ২শ' ডলার আয় করেছি।
রিফাত গৌরী অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনিও একইভাবে ইন্টারনেটে আয় করে বেশ ভালোভাবে নিজের খরচ চালাচ্ছেন। কাজ করতে কেমন লাগে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভালোভাবে শিখে নিয়েছি এখন তা প্রয়োগ করছি। তবে এ কাজে ধৈর্য খুব বড় বিষয়। প্রথমেই অনেক টাকা আয় করা যাবে তা নয়, আস্তে আস্তে বাড়বে। আমি ৪ মাস ধরে কাজ শুরু করেছি। বর্তমানে মাসে সর্বোচ্চ ৩শ' ডলার পর্যন্ত আয় করেছি। ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশা করছি। এ বিষয়টি আপনার পরিবার কীভাবে মূল্যায়ন করছে জানতে চাইলে রিফাত জানান, প্রথম প্রথম সবাই ভেবেছে, অহেতুক সময় নষ্ট করছি। এখন তারা নিজেরাই দেখছে খুব সহজে কোনো রকম ভোগান্তি ছাড়াই আয় করছি। এতে তারা বেশ খুশি। কোনো মেয়ে যদি ঘণ্টা হিসেবেও কাজ করে তাহলে প্রতি মাসে কম হলেও ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারবে।
অনলাইনে দীর্ঘদিন ধরে আয় করছেন নাহিদা জাহান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমি এ কাজে যুক্ত আছি। কাজে স্বাধীনতা আছে তাই আনন্দ পাই। তিনি বলেন, আইটির ওপর লেখাপড়া করেছি, যা আমার কাজের পরিধিকে আরও বাড়িয়েছে। যাদের সৃজনশীল কিছু করার আগ্রহ আছে তারা এ কাজে খুব আনন্দ পাবে বলে আমার ধারণা।
বিআইডিডিতে ১ বছর ধরে ট্রেনার হিসেবে কাজ করছেন নাহিদা। নিজস্ব একটি আইটি ফার্মও আছে তার, যেখানে সফটওয়্যারের কাজ করছেন। এ ছাড়া ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে আইটি ডিপার্টমেন্টে পার্টটাইম লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত আছেন। এ কাজে সুবিধা-অসুবিধার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেয়েদের আউটসোর্সিং সম্পর্কে ধারণা খুবই কম এবং মেয়েদের মধ্যে কম্পিউটার চর্চাটাও কম। এ ছাড়াও মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছুটা বাধ্য-বাধকতা থেকে যায়। তাছাড়া সৃজনশীল কাজে ধৈর্য ধরতে হয়, যা অনেকেই পারে না। সময়ও দিতে হয়। অনেকের পক্ষে সময় দেওয়াটাও কঠিন হয়ে যায়। তবে ইচ্ছাটা হলো বড় বিষয়। আমি মনে করি, মেয়েদের ব্যাপক সম্ভাবনা আছে এ পথে। কারণ যেসব মেয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজে নিযুক্ত হয়ে গেছে তারা ভালো আয় করছে। যেহেতু ঘরে বসেই করা যায়, তাই প্রশিক্ষণ নিয়ে গৃহিণীরা এ কাজ করে পরনির্ভরশীলতা দূর করতে পারেন।
সর্বনিম্ন ইন্টারমিডিয়েট পাস যে কোনো মেয়েও যদি তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক ধারণা নিয়ে আউটসোর্সিংয়ের বিভিন্ন বিভাগে কাজ করে অর্থাৎ সে যদি ফ্রিল্যান্সিংও করে, তবে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতে পারবে। আর কেউ যদি নির্ধারিত প্রকল্প অনুযায়ী কাজ করে সে ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা প্রতি মাসে আয় করতে পারবে বলে জানান বিআইডিডির পরিচালক সুব্রত রাহা।
ফিলিপাইন, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মেয়েরা আউটসোর্সিং করে প্রচুর টাকা আয় করছেন এবং গৃহিণীরাই অনেক বেশি নিয়োজিত এ কাজে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আমাদের দেশে বর্তমানে সরকারের যে পরিমাণ বিনিয়োগ রয়েছে তার সঠিক ব্যবহার হলে এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞানে শিক্ষিত করতে পারলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহুরে নারী, সবাইকে অনলাইন আয়ের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ সহজলভ্য করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
সৌজন্যে : সমকাল












