প্রধানমন্ত্রী আমাকে ব্ল্যাংক চেক দিয়েছেন: প্রিয়.কম-এর সাথে সাক্ষ্যাৎকারে সাহারা খাতুন

(প্রিয় টেক) তিন সপ্তাহেরও বেশী হয়ে গেছে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। প্রথম দফায় তিনি কেবল শুভেচ্ছা বিনিময়ের কাজ করছেন। ইতিমধ্যে এ সংশ্লিষ্ট কাজও শুরু করে দিয়েছেন। টেলিযোগাযোগ খাতকে আরো এগিয়ে নিতে তার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রিয়.কমকে। ইতিমধ্যে কিছু কিছু কাজ বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে। গত শনিবার তার সরকারি বাসভবনে প্রিয়.কম-কে দেয়া সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ তুলে ধরা হলো।
প্রিয় টেক : অপানার প্রধান পাঁচটি অগ্রাধিকার কি? হাতে আর মাত্র এক বছর সময় আছে?
সাহারা খাতুন: প্রধান অগ্রাধিকার টেলিযোগাযোগ খাতে ভিওআইপি নামের যে কলঙ্ক আছে এই অল্প সময়ে তার যতোটা সম্ভব দূর করা। তবে এটিও ঠিক যে আমি মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। প্রতি মুহুর্তে আমাকে শিখতে হচ্ছে। যতো দ্রুত সব কিছু শিখে উঠতে পারব ততো দ্রুতই এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তবে এটিও ঠিক যে ইতিমধ্যে অবৈধ কলের পরিমান অনেকটা কমে আসেছে।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হল অবহেলিত ডাক বিভাগকে যতো দ্রুত সম্ভব নিজেদের পায়ে দাঁড় করানো। ডাক বিভাগের যে ক্ষমতা ছিল সেটি আবার সবাইকে উপলব্ধির মধ্যে নিয়ে আসতে চাই। দেখাতে চাই যে ডাক বিভাগের মাধ্যমেও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
প্রিয় টেক : এখন সবচেয়ে বেশী কথা হচ্ছে অবৈধ টার্মিনেশন নিয়ে। বলা হয়, মন্ত্রনালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে বিটিআরসি, বিটিসিএল সব জায়গার শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত।
সাহারা খাতুন: কে জড়িত না জড়িত সে বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আমি সকলের প্রতি আহবান জানিয়েছি যাতে কেউ যদি এর সঙ্গে জড়িত থেকেও থাকে তারা যেন যতো দ্রুত সম্ভব নিজেদের শুধরে নিয়ে অবৈধ ব্যবসা থেকে ফিরে আসেন। আহবানে কাজ হয়েছে বলেই মনে হয়।
প্রিয় টেক : ভিওআইপি’র কারণে সরকারের প্রতি দিন কোটি কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। কিভাবে এর সমাধানে যাবেন?
সাহারা খাতুন: প্রধানমন্ত্রী যখন আমাকে এই মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন তখনও তার সঙ্গে এটি নিয়ে কথা বলেছি। সব মিলে গত তিন সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এগুলো নিয়ে তিন বার কথা হয়েছে। সরকারের আয়ের সর্বোচ্চ অংশ যাতে নিশ্চিত হয় তার জন্যে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। আর প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে আমাকে ব্ল্যাংক চেক দিয়েছেন।
প্রিয় টেক : সরকারের কেউ যদি এর সঙ্গে জড়িত থেকে থাকে তাহলে কিভাবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন?
সাহারা খাতুন: আবারো বলছি, টেলিযোগাযোগ খাতে আমি এখনো ‘লেম্যান’। জানি না কে কিভাবে এই অবৈধ ব্যবসা থেকে টাকা করছে। তবে আমি যতো দ্রুত সম্ভব শিখে ওঠার চেষ্টা করছি। সরকার বা সরকারি দলের কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যেই হোক না কোনো তার কোনো ক্ষমা নাই।

প্রিয় টেক : সাইবার ক্রাইমও আগে যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেড়েছে। এক্ষেত্রে ভূয়া নিবন্ধনের সিম খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে কি পদক্ষেপ নেবেন?
সাহারা খাতুন: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে থাকাকালেও এ বিষয়ে আমার মনোযোগ ছিল। তখনো আমি এ বিষয়ে কথা বলেছি। মোবাইল ফোন অপারেটরদের নিয়ে বারবার বসেছি। তাদের কথা যেমন শুনেছি। আবার আমাদের বাস্তবতাও তাদেরকে বুঝিয়ে বলেছি। তার পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে।
প্রিয় টেক : সাইবার ক্রাইম বিষয়ে কি আলাদা আর কোনো আইন প্রয়োজন আছে?
সাহারা খাতুন: আমি তেমনটা মনে করি না। এখনো যতোটুকু মনে হয়েছে তাতে হয়তো আর কোনো আইন করা প্রয়োজন হবে না। তবে এক্ষেত্রে আন্ত-মন্ত্রনালয় বৈঠকের মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দেখা যাক, তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রনালয় বা আমার টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্টরা কি বলেন!
প্রিয় টেক : বিটিআরসি-মন্ত্রনালয়-অপারেটরদের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটা দ্বন্দ অনেক দিন থেকে চলছে। কিভাবে সমাধানে পৌঁছাবেন?
সাহারা খাতুন: গত তিন সপ্তাহে তো আমি কোনো দ্বন্দ দেখছি না। আর দ্বন্দ যদি কিছু হয়েই থাকে তাহলে কি কারণে তা হচ্ছে সেটিও খুঁজে দেখতে হবে। নাকি প্রকৃত দ্বন্দ যতোটা তার চেয়ে বেশী অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আইনের সামান্য সংশোধনীর কারণে যদি কিছু ক্ষেত্রে বিটিআরসি’র কিছু কাজে মন্ত্রনালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় সেটি তাদেরকে মেনে নিতে হবে। সরকারতো কাজের সুবিধার জন্যেই আইনের পরিবর্তন করেছে; অসুবিধা বাড়ানোর জন্যে নয়।
প্রিয় টেক : অপারেটররা বলছে, তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থায় চলে এসেছে। গত দেড় দশকে এতোটা চ্যালেঞ্জ তারা কখনোই ফেস করেনি?
সাহারা খাতুন: ইতিমধ্যে আমি মোবাইল ফোন অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলছি। এখন পর্যন্ত শুভেচ্ছা বিনিময়ই চলছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি আমি তাদের সমস্যা এবং চাহিদা নিয়েও কথা বলব। আওয়ামী লীগের সরকার যখন ক্ষমতা আছে তখন এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। এই সরকার সমস্যা বাড়ায় না; বরং সমস্যা কমিয়ে আনে।
প্রিয় টেক : থ্রি জি আনছে টেলিটক। বাকিদের ক্ষেত্রে কি করবেন?
সাহারা খাতুন: টেলিটকের থ্রি জি চমক দেখাবে। টেলিটকের লোকেরা আমাকে সেভাবেই সব কিছু জানিয়েছে। ইতিমধ্যে আমি নিজে গিয়ে সব কিছু দেখে এসেছি। ১৪ অক্টোবর উদ্ভোধন হবে। টেলিটক পরীক্ষামূকভাবে এই সেবা চালু করার অল্প দিনের মধ্যেই বাকিদের জন্যেও নিলামের মাধ্যমে থ্রি জি উন্মুক্ত করা হবে। তার আগে নীতিমালাও চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
প্রিয় টেক : ল্যাপটপ নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। ল্যাপটপ তো সবার হাতে পৌঁছে দেওয়াও সম্ভব হয়নি।
সাহারা খাতুন: আমি নিজে গিয়ে ল্যাপটপের কার্যক্রম দেখে এসেছি। যা দেখেছি তাতে আমি সন্তুষ্ঠু। তবে সবার হাতে অল্প দামে কিভাবে উন্নততর এই প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া যায় সেটি নিয়ে আমাদেরকে আরো ভাবতে হবে।

প্রিয় টেক: ২৫ হাজার ট্যাবলেটও করবেন বলে শোনা যাচ্ছে?
সাহারা খাতুন: আমিও জেনেছি এই খবর। নিশ্চয়ই আমরা সেরা প্রযুক্তির সাপোর্টই সবাইকে দিতে পারব।
প্রিয় টেক : বলা হচ্ছে আইসিটি এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রনালয় একত্রিত হবে। তাহলে পরিস্থিতি কি দাঁড়াবে?
সাহারা খাতুন: আমি এখনো এ বিষয়ে কিছুই জানতে পারিনি। দেখা যাক প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত কি সিদ্ধান্ত নেন। এ পর্যায়ে আমার কিছু বলা বোধ হয় ঠিক হবে না।
প্রিয় টেক : টেলিযোগাযোগ নীতিমালার বয়স ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। নতুন করে কিভাবে কাজ করা যায়?
সাহারা খাতুন: নীতিমালা সংশোধনের জন্যে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) একাধিক পরামর্শক এসে আমাদের সবগুলো বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। তাদের মতামত আমাদেরকে জানিয়েছে। আমরাও ফিরতি বার্তায় তাদেরকে আরো কিছু বিষয় যুক্ত করার কথা বলেছি। খুব তাড়াতাড়ি আধুনিক একটি নীতিমালা পাওয়া যাবে আশা করি।
প্রিয় টেক: ফ্লেক্সিলোড নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে? তার তো যে কোনো সময় যে কোনো অপারেটরকে বসিয়ে দিতে পারে।
সাহারা খাতুন: এই বিষয়টিতো অপারেটরদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে। তাছাড়া বিটিআরসিও এ বিষয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে। আমার পর্যন্ত আসার আগেই এর সমাধান হয়ে যাবে।
প্রিয় টেক : ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে কতোটা অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে?
সাহারা খাতুন: এখানে উল্টো আমি প্রশ্ন করতে চাই। আপনারা সবাই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। আপনারাই বলতে পারবেন পরস্থিতির কতোটা উন্নতি হয়েছে, নাকি অবনতি হয়েছে। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দেন।
প্রিয় টেক : আমাদের মনে হয়েছে, চার বছর আগের তুলনায় আমরা অনেকটা এগিয়েছি। কিন্তু যতোটা এগুনোর কথা ছিল, এই সরকার যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছিল ততোটা কি হয়েছে?
সাহারা খাতুন: আমরা ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছি। আমি তো মনে করি সঠিক পথেই এগুচ্ছে সব কিছু। মোবাইল ফোনে এখন যতো কিছু করা সম্ভব হচ্ছে ততোটা কি আগে কখনো করা গেছে? সামনের দিনে মানুষ আরো চমক দেখবে।
প্রিয় টেক: আপনার এই ব্যস্ততার মাঝে আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।
সাহারা খাতুন: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। বাংলা ভাষায় প্রযুক্তি নিয়ে এমন একটি বড় কাজ প্রতিদিন করে যাওয়ার জন্য আপনাদের প্রসংশা করছি।













