জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯ ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন-মিঠু's picture

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের অন্যতম উপাদান হিসেবে পরিগণিত এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজের মূল চালিকা শক্তি এটা অস্বীকার করার কোন পথ নাই। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিতামূলক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের কর্ম-প্রক্রিয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কর্তৃক জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯ গৃহীত (জুলাই ২০০৯ এ গৃহীত) হয়েছে।

একটি মাত্র রূপকল্প, ১০টি উদ্দেশ্য, ৫৬টি কৌশলগত বিষয়বস্তু এবং ৩০৬টি করণীয় বিষয়কে এ নীতিমালায় পিরামিড আকারে ক্রমবিভক্ত করে সাজানো হয়েছে। ৩০৬টি করণীয় বিষয়ের পাশাপাশি প্রত্যাশিত ফলাফলগুলোও বর্ণনা করা হয়েছে। জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯ বাস্তবায়নে করণীয় বিষয়সমূহকে স্বল্প (১৮ মাস বা তার কম সময়), মধ্য (৫ বছর বা তার কম সময়) ও দীর্ঘ (১০ বছর বা তার কম সময়) মেয়াদে বাস্তবায়নের নিমিত্তে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থাভিত্তিক বিন্যস্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে ‘রূপকল্প ২০২১: ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার কাজ ত্বরান্বিত হবে বলে আমরা আশা করছি। এ নীতিমালা রাষ্ট্রের সকল পরিকল্পনাবিদ এবং নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য একটি পালনীয় নির্দেশিকা। একই সঙ্গে এটি ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানের জন্য বিনিয়োগ, এনজিও এবং সুশীল সমাজের জন্য সামাজিক উদ্যোগ এবং ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে জনসেবা প্রদানের জন্য একটি সার্বিক নির্দেশনা। অর্থাৎ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে তার সুফল সর্বস্তরের মানুয়ের কাছে পৌছে দেবার লক্ষ্যে জনপ্রশাসন কর্তৃক পালনীয় নির্দেশিকাই হচ্ছে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯।

নীতিমালায় সরকার নিয়ন্ত্রীত ৪৯টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা ওয়ারী করণীয়, কৌশলগত বিষয়বস্তু, নীতিমালার ক্রমিক নম্বর, করণীয় বিষয়, প্রাথমিক বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, প্রত্যাশিত ফলাফল এবং একই সাথে বাস্তবায়নের সময় ইত্যাদি বিষয় গুলোকে আলাদা করে টেবিল আকারে দেখানো হয়েছে যা অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। এতে করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অতিসহযেই তাদের করণীয় বিষয় গুলো সম্পর্কে অবহিত হয়ে প্রত্যাশিত ফলাফল প্রপ্তির লক্ষ্যে সার্বিক নির্দেশনা বাস্তবায়নের পথে এগুতে পারবে সুচারুভাবে।

৪৯টি মন্ত্রণালয়/বিভাগ/সংস্থা ওয়ারী করণীয় বিষয়গুলো বিশ্লেষন করে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক (স্টারিক মার্ক দেয়া রয়েছে) করণীয় বিষয় হিসেবে নীতিমালার ক্রমিক নম্বর ৯৬ কে দেয়া হয়েছে যেখানে বলা আছে ‘‘সরকারী পর্যায়ের সকল প্রতিষ্ঠানে আইসিটি পেশাজীবী দ্বারা সজ্জিত আইসিটি সেল স্থাপন। এ সেলের জন্য আইসিটি সংশ্লিষ্ট পদ সৃজন করা। সরকারী পর্যায়ের সকল আইসিটি সংশ্লিষ্ট পদকে কারিগরি পদ হিসেবে চিহ্নিতকরণ’’ এবং প্রত্যাশিত ফলাফল কলামে বলা হয়েছে, “ই-গভর্নেন্স প্রকল্পের স্থায়ীত্ব নিশ্চিত করবে। সরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা হবে”। এখানে একটি প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক আর তা হলো সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের জন্য আইসিটি সেল এর ন্যূনতম আকার/কাঠামো কেমন হওয়া উচিত ? বা এ সম্পর্কে কোন নির্দেশনা কোথাও আছে কিনা ? এটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

আইসিটি পেশাজীবী দ্বারা সজ্জিত আইসিটি সেল স্থাপন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে উল্ল্যেখ করতে হচ্ছে ১৯৮৫ সালে তৎকালীণ সরকার কর্তৃক প্রণীত কম্পিউটার প্রফেশনাল রিক্রুটমেন্ট রোলস, ১৯৮৫ (NO. S.R.O 104-L/85/ME/RI/R-9/84) এ কম্পিউটার প্রফেশনাল (সহকারী প্রোগ্রামার/ প্রোগ্রামার/ সিস্টেম এনালিষ্ট/ সিনিয়র সিস্টেম এনালিষ্ট/ সিস্টেম ম্যানেজার) হিসেবে আবেদন করতে/ নিয়োগপেতে যোগ্যতা হিসেবে যেকোন বিষয়ে মাষ্টার্স ডিগ্রী বা বিএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) অথবা কম্পিউটার সায়েন্স এ ডিগ্রী। অথবা ক্ষেত্র বিশেষে নির্দিষ্ট কিছু পদে কম্পিউটার সায়েন্স ব্যতিত অন্যান্য কয়েটি বিষয় উল্লেখপূর্বক মাষ্টার্স ডিগ্রী চাওয়া হয়েছে। ১৯৮৫ সালে যখন রোলসটি করা হয়েছিল তখন কম্পিউটার সায়েন্স/ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ডিগ্রী ধারী প্রার্থী পাওয়া যাবেনা বিবেচনা করে হয়তোবা এমনটা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশেই প্রতিবছর বিভিন্ন সরকারি/বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে কমপক্ষে পাঁচ হাজার কম্পিউটার সায়েন্স/ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ফ্রেস গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে। সুতরাং রোলসটি পুনরবিবেচনা করে সময় উপযোগী করা পয়োজন।

প্রসঙ্গক্রমে বলাযায়, হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য যদি ডাক্তার (নূন্যতম এমবিবিএস ডিগ্রী) ছাড়া অন্য কেউ উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত না হয়, তবে আইসিটি সেল পরিচালনার জন্য আইসিটি বিষয়ে গ্রাজুয়েট ছাড়া অন্যকেউ বিবেচিত হন কি করে? অনেকেই আমার সাথে দ্বিমত পুষণ করে বলবেন হয়তো, আইসিটি বিষয়ে কিছু প্রশিক্ষণ থাকলেইতো এ বিষয়ে কাজ করা সম্ভব। বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য একটি বাস্তব উদাহরণ দেয়া সমিচীন হবে বলে মনে করছি। কিছুদিন আগে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের হেডিং ছিল “স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের জীবন-মৃত্যু নিয়ে বানিজ্য করছে ভূয়া ডাক্তার” সংবাদটির মূল বিষয় বস্তু ছিল এমনঃ আরাফাত মল্লিক নামের একব্যক্তি স্বাস্থ্য সহকারি হলেও নিজেই নিজেকে ডাক্তার দাবি করেন। ফিস নিয়ে নামের আগে ডাক্তার লেখা ব্যবস্থাপত্র দিয়ে রুগী দেখেন তিনি। সাংবাদিকদের কাছে এমন অভিযোগ শুনে এবং ডাক্তার লেখা ব্যবস্থাপত্র দেখে আরাফাত মল্লিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন বলেন, সেখানে স্বাস্থ্য সহকারির দায়িত্বে থাকা আরাফাত মল্লিকের ব্যবস্থাপত্রে ডাঃ লিখে রুগী দেখার কোন ভাবেই বৈধতা নেই। এখন কথা হচ্ছে, যেহেতু আরাফাত মল্লিক স্বাস্থ্য সহকারির দায়িত্বে আছেন অতএব আমরা ধরে নিতে পারি যে, চিকিৎস্যা সংক্রান্ত বিষয়ে তার যতসামান্য হলেও প্রশিক্ষণ রয়েছে। কিন্তু মূল সমস্যাটা হচ্ছে তার এমবিবিএস ডিগ্রী নেই। অর্থাৎ প্রশিক্ষণলব্দ কিছু জ্ঞানের মাধ্যমে কোন একটি কাজ পনিপূর্ণভাবে সম্পাদন করা বা সে সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। যদি সম্ভব হতো তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয়ে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে গ্রাজুয়েসন বা ডিগ্রী কোর্স চালু করার কোন প্রয়োজন ছিলনা এবং মেডিক্যাল/ইঞ্জিনিয়ারিং/বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কিংবা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠত। তাই নয়কি?

বর্তমান সরকার জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে সরকারের সকল প্রতিশ্রুত সেবা জনগণের হাতের নাগালে পৌছে দিতে চায়। আর সরকারের সেবাসমূহকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রুপান্তর করতে হলে অবশ্যই আইসিটি পেশাজীবী দ্বারা সজ্জিত আইসিটি সেল স্থাপন করতে হবে। এবং ক্ষেত্র বিশেষে আইসিটি বিষয়ক কর্যক্রম ও সেবা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত করা প্রয়োজন। অন্যথায় নীতিমালায় উল্লিখিত- প্রত্যাশিত ফলাফল প্রাপ্তিতে ব্যাত্যয় হওয়াটাই স্বাভাবিক।

আশার কথা এই যে, সরকার জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা-২০০৯ আরো যুগউপযোগী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রযোজ্যক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে সে অনুযায়ী অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন। তবেই প্রত্যাসানুযায়ী প্রাপ্তি সম্ভব।

[লেখকঃ প্রোগ্রামার, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, ঢাকা।
ই-মেইলঃ mithu_cse24@yahoo.com]
তারিখঃ ৩০/১০/২০১২ খ্রিঃ।

একই রকম আরো কিছু পোস্ট