আমাদের সাধারণ জীবনেরই গল্প এইসব

সন্ধ্যে হলেই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে খালিশপুরের শিশুপার্ক। জুয়েলের চায়ের দোকান ভরে ওঠে অনেক কিশোর-তরুণের হৈ-হুল্লোড়ে। জীবন সম্পৃক্ত কোন আলোচনাই এখানে আর অপ্রাসঙ্গিক বা অশ্লীল শোনায় না। প্রত্যেকেই তার ভেতরের মানুষটিকে উগরে দিয়ে সমস্ত সন্ধ্যা আড্ডায় উচ্ছাসে অন্যরকম এক লাবণ্য নিয়ে রাত করে বাড়ি ফেরে। একটার পর একটা চা-সিগ্রেট সাথে নানান বর্ণের রসিকতায় সন্ধ্যা হঠাৎ হাওয়া হয়ে যায়। আজকের আড্ডাটা ঠিক প্রতিদিনের মতো নয়। আজকের আড্ডার মধ্যমণি শিশির।
শিশির আজ বাইশে পা দিয়েছে। তার জন্মদিনকে ঘিরে আজকের আড্ডাটা এক অন্যরকম প্রাণ পেয়েছে। প্রতিদিন সাধারণত আড্ডার প্রধান বিষয় থাকে নারী কখনও খেলাধূলা, শিক্ষকদের নিয়ে দূর্বচন, খাবার-দাবার থেকে শুরু করে জীবনের সমস্ত সুন্দর-অশ্লীল বিষয়গুলো আলোচ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ফেসবুক নিয়ে মাতামাতি করে সন্ধ্যে পার হয়ে যায় মাঝে মাঝে। কার ফ্রেন্ড লিস্টে মেয়েদের সংখ্যা কত, কে কি কমেন্ট করেছে, কোন স্ট্যাটাসটি ভালো লেগেছে, কে কি ছবি আপলোড করেছে এইসব আরো কতো কি। শিশির প্রায় সব সময় এই ফেসবুক বা ইন্টারনেট সংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ না করে নীরব শ্রোতা হয়ে থাকতো। কারণ তার নেট সংযোগ তো দূরের কথা কম্পিউটারই নেই। বন্ধুদের ফেসবুক নিয়ে এতো মাতামাতিতে তারও অংশ গ্রহণের অভিপ্রায় আছে। কিন্তু এ জন্য যথেষ্ঠ সামর্থ্য বর্তমানে তার নেই। তারিক অনেক আগেই ফেসবুক নিয়ে এতো মাতামাতি করার সময় লক্ষ্য করেছে শিশিরের চোখে মুখে এক ধরণের অভাব পরিষ্কার বোঝা যায়। একজন ভালো বন্ধু হিসেবে তারিক অন্যরকম। তাই আজ শিশিরের জন্মদিনে সে ঠিক করেছে তার এক্সট্রা ল্যাপটপটি তাকে গিফট করবে। শিশিরের সেদিন ল্যাপটপটি পেয়ে আনন্দ-বেদনার মুখ স্পষ্ট ছবি হয়ে ধরা দিয়েছিল। কিছুদিন পর সে একটি মডেম সংগ্রহ করে ভার্চুয়াল জীবনের সাথে পরিচিত হয়।
তারপর সে শুধু ফেসবুকে মেয়ে বন্ধুদের লিস্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকে নি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্থ আয়ের বিষয়টি সে গল্পে গল্পে বিভিন্ন বন্ধুদের সাথে আলাপ করতো। একদিন সে স্পিক এশিয়ার মতো একটি উড়ো কোম্পানির ক্লিক বাণিজ্যের ফাঁদে আটকেও গিয়েছিল। মধ্যবিত্ত মন এত সহজেই অর্থ আয়ের লোভ সংবরণ করতে পারে নি। তারপর এক সময় সে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারলো তবে ভেঙ্গে পরে নি। এরপর সে এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে একটি এসইও টিমের সাথে কিছুদিন কাজ করা শুরু করলো। তারপর একদিন সে খুলানায় প্রতিনিধিত্বকারি তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রাণন লি: এর নাম শুনে তাদের অফিসে যায়। সেখানে প্রাণনের নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদুল ইসলাম রুমেলের সাথে কথা বলে সে ভীষণ মুগ্ধ হয় এবং নিজের স্বপ্নকে আরো বড় পরিসরে ভাবতে থাকে। তারপর সে বিআইআইসি-প্রাণনের এক বছর মেয়াদি আই টি এন্টারপ্রেণার প্রকল্পে অর্ন্তভূক্ত হয় এবং সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার পাশাপশি সে অর্থ উপার্জন করা শুরু করে যা তার ভবিষ্যতে নিজের কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
গল্পে পরের অংশে শিশির একজন তথ্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সি ইও, তবে লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো কিভাবে চায়ের আড্ডা থেকে একজন শিশির কোথায় পৌঁছালো। তার ইচ্ছাশক্তি এবং ক্লিক ব্যবসায়ীদের প্রতারণার ফাঁদে আটকে যেয়েও সে ভেঙ্গে পড়ে নি বরং নতুন উদ্যমে সে আবার শুরু করেছে। নতুন পথের সন্ধান সে নিজেই খুঁজে নিয়েছে। এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখা দরকার শুধু শিশিরের প্রাথমিক অভাব ছিল কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট সংযোগ। সেটি পাওয়া মাত্রই শিশির তার নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করে নিয়েছে। সুতরাং আমাদের উচিত সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে প্রাণন লি: এর মতো এরকম আরো অনেক প্রতিষ্ঠান আই টি উদ্যোক্তা তৈরিতে বা আই টি খাতে অবকাঠামোগত সেবা এবং প্রশিক্ষণ মূলক সেবা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসা। তাহলে এরকম অনেক শিশির তাদের নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানের প্রতিও অবদান রাখতে পারে।
এখন একটি বাড়ি একটি খামার কিংবা ছাগল প্রদান কর্মসূচীর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত একটি কম্পিউটার সাথে ইন্টারনেট সংযোগ তাহলে শুধুমাত্র আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেই বাংলাদেশ অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে সেই সাথে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
- sultanmahmudratan's blog
- Login or register to post comments










