অবহেলিত ইন্টারনেট অধিকার

Reza Salim's picture

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৭তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী এখন নিউইয়র্কে। অধিবেশনে এবার যে কয়টি বিষয় চূড়ান্ত মীমাংসার দিকে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো, ২০১৫ সালের অর্জন লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় রেখে দুনিয়াজুড়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ও অঙ্গীকারের নির্দেশিত পথে দেশগুলোর ‘অগ্রগতি প্রতিবেদন’ পর্যালোচনা। সেখানে ‘সর্বজনীন ব্রডব্যান্ড’ প্রাপ্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে আহ্বান করা আছে, ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ দূর করতে ‘কার্যকরী ব্যবস্থা’ নিয়ে ‘উদ্ভাবনমূলক অগ্রাধিকার পন্থা’ যেন সবাই অবলম্বন করে, যাতে ‘সাশ্রয়ী সর্বজনীন ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট’ সেবা নিশ্চিত হয়।

বাংলাদেশ ২০০৩ ও ২০০৫ সালের তথ্যসমাজ শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণাপত্র ও কর্মকৌশল বাস্তবায়নের অঙ্গীকারবদ্ধ দেশগুলোর অন্যতম। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতি, আইন, বিধি ও কৌশল প্রবর্তন করে বর্তমান সরকারের আমলে এসে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই, জাতিসংঘের পদক্ষেপের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়েও বাংলাদেশ অনেকগুলো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে। অপর দিকে একটি জাতির সম্ভাবনাময় তরুণ শক্তির জন্য সরকারের অনেক পদক্ষেপই অনুপ্রেরণামূলক হয়ে ওঠেনি। তার অন্যতম কারণ, ইন্টারনেট ব্যবহারের শক্তিকে পুঁজি করে জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনার অনুপস্থিতি। এই অনুপস্থিত নির্দেশনার প্রধান প্রধান পটভূমি তৈরি হয়েছে আমাদেরই কিছু ভুল বা সীমাবদ্ধতার জন্য, যেমন—

১. যেসব প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিভাগগুলো নেয়, সেখানে বাংলাদেশের ক্রমাগত অনুপস্থিতি। আমরা মনে রাখি না বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র এর সদস্য হিসেবে সব কর্মকাণ্ডের অংশীদার। আমাদের যথাযথ অংশীদারি ভূমিকার অভাবে গৃহীত পদক্ষেপ, আর্থিক বিবেচনা আর অগ্রগতির সূচক বিন্যাসে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। এর প্রতিফলন পড়ছে দেশের নীতি গ্রহণে ও বাস্তবায়নে।
২. দেশের অভ্যন্তরে ‘তথ্যপ্রযুক্তি নীতি’ ও এর ‘কর্মকৌশল’ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়নি, তার প্রধান কারণ, এই নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ কর্মযজ্ঞ সরকার নিয়ন্ত্রিত পরিষেবা প্রদানে বিন্যস্ত হয়েছে। ‘উদ্ভাবন’ বলে সরকার যেটাকে দেখছে, তা আন্তর্জাতিক রীতি-সংস্কৃতির পরিপন্থী। ‘ডিজিটাল সম্পৃক্তি’ (Digital Inclusion) আর ‘ডিজিটাল উদ্ভাবন’কে (Inovation) এক করে ফেলে সরকারি দপ্তরগুলোর কর্মকাণ্ড এমনভাবে সামনে এনে ফেলা হয়েছে, তাতে তরুণদের একটি বড় অংশ ভেবে বসে আছে, ‘আমাদের হয়তো আদৌ আর কিছু করণীয় নেই, যা করার তা সরকার করবে!’

অপর দিকে দুর্বল ইন্টারনেটই বড় অন্তরায়। সরকার এটা ভালো করে না বুঝলে হতাশায় থাকা ছাড়া উপায় কী? আমাদের কাছে যে পরিমাণ ‘ব্যান্ডউইথ’ আছে বা যে উচ্চগতির ইন্টারনেট আমরা ইতিমধ্যে পেয়েছি, তার মূল্য পরিশোধ করেছে এই জাতি। ফলে স্বাভাবিক যে এই ইন্টারনেট পাওয়ার অধিকার জাতির সবারই। কিন্তু তা না করে সরকার কখনো কখনো চিন্তা করছে বিদেশে ‘ব্যান্ডউইথ’ রপ্তানি করার, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক! অপর দিকে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রাপ্তির প্রক্রিয়াও এমনই জটিল যে বিটিসিএলের অফিসে এসব জানতে গেলে বিস্মিত হতে হয়! কাগজে যেসব প্রক্রিয়া বলা আছে, কোনো সৃজনশীল তরুণ এই জটিল পথে ইন্টারনেট পেতে যাবে না। কিন্তু বিকল্প কী? সরকার সযতনে ইন্টারনেট দিয়েছে মোবাইল কোম্পানিগুলোকে, যারা উচ্চমূল্যে অত্যন্ত ধীরগতির ইন্টারনেট দেয়।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরকারের এই ক্রমাগত নিয়ন্ত্রণকামী অভ্যস্ততার কারণে আমাদের দেশের কাম্য ‘উদ্ভাবন’ আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণে অক্ষম। যেসব সম্পূরক বেসরকারি সংস্থা সরকারকে নানাভাবে সহায়তা করে বলে প্রচলিত, এদের মনঃসংযোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত ও সরকারের নীতি বাস্তবায়নের চেয়ে তল্পিবাহক হিসেবেই বেশির ভাগ দায়িত্ব পালন করে। ফলে সরকারের পক্ষেও তার নীতিগুলো সম্পর্কে জনমানসের ভাব জানা কঠিন হয়ে পড়ে।

সারা দুনিয়ায় এখন ইন্টারনেট জনগণের অধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতিসংঘের মহাসচিবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে অঙ্গ সংস্থা আইটিইউ আর ইউনেসকোর উদ্যোগে বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘ব্রডব্যান্ড কমিশন ফর ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ গঠন করা হয়েছে। ২০১০ সালেই এই ব্রডব্যান্ড কমিশন ২০১৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ব্রডব্যান্ড অর্জন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে শতকরা ৪০ ভাগ গৃহস্থালি। এর দরকার সর্বজনীন ‘ব্রডব্যান্ড নীতি’, যা বাংলাদেশের জন্য অতি জরুরি। আর মাত্র তিন বছর বাকি, বাংলাদেশ কত দূর এগিয়েছে?

বাংলাদেশে এখনো উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার ব্যয়বহুল। এমনকি সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সংযোগ-প্রক্রিয়া অতি জটিল ও হাস্যকর নিয়ন্ত্রণের অধীন! প্রতিবেশী দেশ ভারত বা শ্রীলঙ্কা, এমনকি ভুটানও নিজেদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট মূল্য নির্ধারণ করে তা দ্রুততম সময়ে প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে। আর আমরা এখনো একটি ‘তরুণবান্ধব ইন্টারনেট বিতরণ নীতি’ পর্যন্ত তৈরি করতে পারিনি।

আমাদের বিশ্বাস, সরকার ‘ইন্টারনেট অধিকার’ বিষয়টি সম্যক অনুধাবন করে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও চলমান প্রক্রিয়াগুলোর সঙ্গে নিজেকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করবে। সারা দেশে, বিশেষ করে তরুণদের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট উন্মুক্ত করে সৃজনশীল আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে তাদের উদ্বুদ্ধ করার উদ্যোগ নেবে। ব্যাংকগুলো যেন সহজতর প্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে টাকা পেতে ছেলেমেয়েদের সহজ সুযোগ করে দেয়। এ ক্ষেত্রে কর দেওয়া-নেওয়া নিয়ে চলছে এক আজব অরাজকতা! কেউ যেন কিছুই বুঝতে চাইছে না!

আমাদের মিশনগুলো মুখ দেখে কথা বলে। আগ্রহী তরুণের কাজ পেতে সহযোগিতার হার অতি সামান্য! দেশের মানুষ কখনো কোনো দূতাবাস বা মিশন থেকে একটিও উদ্যোগের খবর পায়নি। অথচ ভারত বা শ্রীলঙ্কায় খোলা হয়েছে বিশেষ ‘প্রবাসী’ জানালা, যা দিয়ে শুধু তরুণদেরই কাজের খোঁজখবর পাওয়া যায়।

প্রধানমন্ত্রীর এবারের নিউইয়র্কে অবস্থানকালে বিষয়গুলো নানাভাবে তাঁর সামনে চলে আসবে, যখন দেশগুলো নিজেদের অগ্রগতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা বা বিতর্ক করবে। আমরা আশা করতে চাই, তিনি ফিরে এসে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে উদ্যমী, উৎসাহী তরুণদের সৃজনশীল কাজের জন্য সহজে উচ্চগতির ইন্টারনেট প্রাপ্তির বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।

রেজা সেলিম: পরিচালক, আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প ও সাবেক সদস্যসচিব, জাতিসংঘ তথ্যসমাজ শীর্ষ সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি।

প্রথম আলোর সৌজন্যে

Tags:

একই রকম আরো কিছু পোস্ট