উইন্ডোজ ফোন ৮: কোন দিকগুলো নিয়ে মাইক্রোসফটের চিন্তা করা উচিত

ইকবাল আহসান's picture

তুখোড় সময় পার করছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট। প্রতিষ্ঠানটি স্মার্টফোন বাজারে উইন্ডোজ ফোন এইটের মাধ্যমে নিজের স্থানটি গড়ে তোলার এমন মোক্ষম সুযোগ আর কখনো পাবে কিনা সেটা বলা কঠিন। এর পেছনে আপনি মাইক্রোসফটের মোবাইল অবকাঠামো অ্যাপল এবং গুগলের সাথে পাল্লা দেবার মত যথেষ্ট ভালো হওয়ার জন্য অথবা সদ্য উন্মোচিত নোকিয়া এবং স্যামসাংয়ের স্মার্টফোনগুলো একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হওয়াকে নির্ধারণ করতে পারেন। এবং মাইক্রোসফটের সাফল্যের পেছনে আপনি যদি এই দুইটি কারণকে নির্ধারণ করেন তাহলে খুব একটা ভুল করেন নি।

আর প্রায় সকল বৈশিষ্ট্য এক রকম হওয়ায় এই দুইটি কারণই উইন্ডোজ ফোন এইট মোবাইল ওএস যুদ্ধে নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচিত করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই দুইয়ের সাহায্যে আপনি কিন্তু অন্যদেরকে আকৃষ্ট করতে পারছেন না। স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে সমসাময়িকতা অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয় এবং মাইক্রোসফট সেখানে বেশ পিছিয়ে রয়েছে।

আর এখানে যদি মাইক্রোসফট জিততে চায় তাহলে প্রতিষ্ঠানটিকে খুঁজে বের করতে হবে নতুন পথ। অ্যাপল বা গুগলের পথে হাঁটলে বিশাল এক ধাক্কা খেতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। প্রতিষ্ঠানটিকে আজকের গ্রাহকেরা যে অবকাঠামো ভিত্তিক মোবাইল ব্যবহার করছে তার সমস্যাগুলোর যোগ্য সমাধান প্রদান করতে হবে। এছাড়া অ্যানড্রয়েড এবং আইওএস এর যে বিষয়গুলো মোবাইল বাহকেরা পছন্দ করে না সে বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে।

মাইক্রোসফট যদি সমস্যাগুলো ধরতে পারে -- এবং ব্যবহারকারীরা বুঝতে পারে যে মাইক্রোসফট এগুলো বুঝতে পেরেছে -- তাহলেই শুধুমাত্র মোবাইল বাজারের এক উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি।

অ্যাপল তার নতুন আইফোনে নতুন কি বৈচিত্র্য যুক্ত করতে পারে সে সম্পর্কে ইতোমধ্যে সকলের একটা ধারণা হয়ে গিয়েছে। আর উইন্ডোজ ফোন এইট ভিত্তিক যে ফোনগুলো বাজারে আসবে সেগুলো এর সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম হবে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে। স্যামসাং তার উইন্ডোজ ফোন এইট ভিত্তিক শ্রেষ্ঠ ফোন আটিভকে আকর্ষণীয় ডিসপ্লে এবং শক্তিশালী প্রসেসর দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছে। আর লুমিয়া ৯২০ এর ক্যামেরার বিজ্ঞাপন এর ব্যাপারে সমালোচনা থাকলেও হার্ডওয়্যারের ক্ষেত্রে অসাধারণ বৈশিষ্ট্য প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থাৎ, হার্ডওয়্যারের দিক থেকে মাইক্রোসফট অন্য যে কোন অবকাঠামোর দিক থেকে পিছিয়ে নেই। আর তাই মাইক্রোসফট যদি সত্যিই বাজারের একটি অংশ দখল করতে আগ্রহী হয়ে তাহলে অন্য দুই অবকাঠামোর সমস্যাগুলো সমাধানের মাধ্যমেই এগুতে হবে। আর এক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা বৈশিষ্ট্য মাইক্রোসফটের জন্য একটা প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কতটা প্রকাশ হয়ে পড়ছে সে ব্যাপারে দিনে দিনে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছে। স্মার্টফোনের অবকাঠামো প্রদানকারীরা যত কম তথ্য জানতে পারে ততবেশি খুশি হয় ভোক্তারা। আর গোপনীয়তার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে মাইক্রোসফট ভোক্তাদের মাঝে এক ভিন্ন স্থান করে নিতে পারে। তেমন ভয়াবহ কিছু করার দরকার নেই, কিন্তু সাধারণ কিছু পরিবর্তন ভোক্তার কাছে মাইক্রোসফট যে একটু বেশি কিছু করতে চাইছে এই বার্তা পৌঁছে দেবার জন্য যথেষ্ট।

অবশ্য নতুন ওএস সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হবার কারণে বাজারের সেরা দুই ওএস এর দেখানো পথেই মাইক্রোসফট অগ্রসর হচ্ছে কি না তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তবে অবস্থা দৃষ্টিতে মাইক্রোসফট যে এ পথে এগুচ্ছে না তার ছোট্ট একটা লক্ষণ আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি প্রতিষ্ঠানটির সদ্য উন্মোচিত আউটলুক.কম এর মাধ্যমে। এই অ্যাপে মাইক্রোসফট ব্যবহারকারী নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন প্রচার করতে নিষেধ করেছে। যা গোপনীয়তা প্রিয় ভোক্তাদের মাঝে বেশ সাড়া জাগিয়েছে।

ব্যবহারকারীদের মন জেতা অত্যন্ত জরুরী, কিন্তু এটা ভুললেও চলবে না যে ব্যবহারকারী ছাড়াও আরেকটি দল রয়েছে যাদের মন জয় করা অত্যন্ত জরুরী। আমি এখানে মোবাইল অপারেটরদের কথা বলছি। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল অপারেটররা একটা মোবাইল সেট বিক্রয়ের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা না রাখলেও উন্নত বিশ্বে জনগণের কাছে যে কোন হ্যান্ডসেট আকর্ষণীয় করে তোলার দায়িত্ব নির্মাতার চাইতে পরিচালকের। এরা এ ব্যাপারে এত শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে যা চিন্তাও করা যায় না। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করছে অ্যানড্রয়েড। গুগল এর প্ররোচনা আর নেটওয়ার্ক পরিচালকদের আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন এই অবকাঠামোকে জনপ্রিয়তা পাইয়ে দিয়েছে অত্যন্ত ঈর্ষণীয় গতিতে।

২০০৯ সালে মার্কিন টেলিযোগাযোগ সেবা দাতা ভেরাইজন অ্যাপলের কর্মকাণ্ডে অখুশি হয়ে বাজারকে স্থিতিশীল করার জন্য প্রচুর বিনিয়োগ করা শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি বাজারে নিয়ে আসে ড্রয়েড এবং এর বিপণন প্রচারণার পেছনে খরচ করে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৯ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে মার্কিন স্মার্টফোন বাজারের বিক্রিত ফোনের ৩০% ছিল আইফোন আর অ্যানড্রয়েডের বিক্রয় হার ছিল ৫.৪%।

পরবর্তী প্রান্তিকে যা অ্যানড্রয়েডের বাজার চারগুণ বেড়ে গিয়ে ২০.৪% এসে দাঁড়ায়। ড্রয়েড সম্পর্কিত প্রচারণা শুরুর এক বছর পর অ্যানড্রয়েড ফোন বিক্রয়ের হার ৫১.৬% আর আইওএস এর বাজার ২০.১% কমে যায়।

তবে উইন্ডোজের দুর্ভাগ্য যে এ ধরণের সাফল্যের অধিকারী সে হতে পারছে না। কারণ এ ক্ষেত্রটিতে এ ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণের জায়গা আর খালি নেই। অ্যানড্রয়েড ব্ল্যাকবেরি এবং সিম্বিয়ান এর পতনশীল অবস্থার সুযোগ নিয়ে বাজারের বিশাল একটি অংশকে দখল করে ফেলে। কিন্তু মাইক্রোসফট যদি বাজার দখল করতে চায় তাহলে তা করতে হবে ভোক্তাদের কাছ থেকে, তাদেরকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে। তারপরেও ইচ্ছা করলেই উইন্ডোজ ফোনকে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাজারে স্থান করে দিতে পারে মোবাইল অপারেটররা। আর অনেক অপারেটরেরা যে তা চাচ্ছে সেটাও ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে আসছে।

সম্প্রতি ভেরাইজন অ্যাপল এবং গুগল যে পরিমাণ বাজার দখল করে আছে তাতে তারা অস্বস্তি বোধ করছে বলে উল্লেখ করেছে এবং ডিসেম্বরে উইন্ডোজ ফোন এইটকে তারা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরবে। একই ধরণের পদক্ষেপ নোকিয়া ইউরোপের অপারেটরদের সাথে করেছে বলেও খবর পাওয়া গিয়েছে।

আর এক্ষেত্রে মাইক্রোসফট যে বিশাল এক ভূমিকা রাখতে পারে, অ্যাপল বা গুগলের চাইতে মোবাইল ক্যারিয়ারদের দিতে পারে অধিক ক্ষমতা। কথা বলতে পারে হ্যান্ডসেট নির্মাতাদের সাথে যেন তারা বিশেষ মূল্যে ক্যারিয়ারদের কাছে পৌঁছে দেয় উইন্ডোজ ফোন। আর এক্ষেত্রে মাইক্রোসফটের কথা অনেক সহজে শুনবে তার অংশীদারেরা।

স্যামসাং এখনো তার এক বিলিয়ন ডলার জরিমানার কথা ভুলে যায়নি। আর এক্ষেত্রে তারা অনেকটাই সহনশীল এবং নমনীয় অবস্থানে থাকবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। তবে অনেকেই নতুন ওএস এর কথাও ভাবছে, এমন একটা ওএস যা অ্যানড্রয়েডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে এবং ক্যারিয়ারদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে সাহায্য করবে।

বহু দশক ধরে পিসি বাজারে সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত মাইক্রোসফট। পিসি অবকাঠামোর রাজা হিসেবে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠান অন্য একটি বাজারে অসহায় হয়ে থাকবে এটা ভাবা অত্যন্ত অন্যায় হয়ে যাবে। বিশেষ করে যেখানে ভোক্তা এবং ক্যারিয়ারগুলো যখন পূর্বের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে থেকে চাহিদা মোতাবেক সেবা পাচ্ছে না তখন এ ধরণের চিন্তা মনে না আনাই ভালো। অনেক দেরীতে ঘুম থেকে জেগে উঠেছে মাইক্রোসফট। কিন্তু তারপরেও প্রতিষ্ঠানটির হাতে আছে দক্ষ একটি অবকাঠামো আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলক কিছু হ্যান্ডসেট। আর তাই মাইক্রোসফটকে যা করতে হবে তা হচ্ছে, ব্যবহারকারীর মন্তব্য শোনা এবং বাজার শ্রেষ্ঠরা যে সুবিধাগুলো থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করছে সেগুলো প্রদান করা। আমাদের বিশ্বাস মাইক্রোসফট তা করতে পারবে।