সাইবার নিরাপত্তার ব্যাপারে হুয়াওয়ের জবাব: আমরা চীনের গুপ্তচর নই

ইকবাল আহসান's picture

আমরা এখন এমন একটা যুগে বাস করছি যখন সাইবার অপরাধ এবং ইলেকট্রনিক এসপিওনাজ নিত্যনৈমিত্তিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। আর এই যখন অবস্থা তখন বিশ্বের বৃহত্তম টেলিযোগাযোগ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি যে আলোচনার বিপক্ষে অবস্থান করতে চাইবে না সেতো জানা কথা হলেও - হুয়াওয়ে প্রায়ই নিজেকে এই অবস্থানে আবিষ্কার করছে। আর এ অবস্থান থেকে সরে গিয়ে অন্য দিকে স্থান করে নেবার জন্য প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

আমরা গুপ্তচর নই - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই বার্তা প্রেরণ করেছে চীনা টেলিযোগাযোগ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা প্রতিষ্ঠানটি নিজ দেশ চীনের সরকারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি অথবা অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এর জবাবে প্রতিষ্ঠানটি ২৪ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন পেশ করেছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন যুক্তরাজ্য সরকারের প্রাক্তন প্রধান তথ্য কর্মকর্তা এবং হুয়াওয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জন সাফোক। তিনি তার প্রতিবেদনে হুয়াওয়ের প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে বিশ্বব্যাপী তার গ্রাহকদের নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

হুয়াওয়ে চীনের বহুজাতিক কোম্পানি, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের ১৪০টি দেশে এবং বিশ্বের বৃহত্তম টেলিকম সংস্থাগুলোর অধিকাংশের কাছে পণ্য এবং সেবা বিক্রয় করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা চীনের একজন প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা। আর এটাই প্রতিষ্ঠানটির সাইবারনিরাপত্তা সংক্রান্ত সম্মান রক্ষার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে গভীর অর্থনৈতিক সুসম্পর্ক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা স্বত্বেও দেশটি সাইবার-নিরাপত্তা এবং ইলেকট্রনিক এসপিওনাজের দিক থেকে কাঁটা হিসেবে বিবেচিত।

এ বছরের শুরুতে মার্কিন হাউজ ইন্টেলিজেন্স কমিটি চীনের প্রধান দুই টেলিযোগাযোগ নির্মাতা হুয়াওয়ে এবং জেডটিই এর কাছে একটি চিঠি পাঠায় যেখানে প্রতিষ্ঠান দুইটির সাথে চীনা সরকারের সম্পর্ক এবং বন্ধন সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

ডাচ রুপার্সবারগার চিঠির মাধ্যমে কমিটির আশঙ্কা যে প্রতিষ্ঠান দুইটির নির্মিত যন্ত্রাংশের সাহায্য নিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেটওয়ার্ক হ্যাক অথবা ভঙ্গের চেষ্টা করতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সরকার একই ধরণের কারণ দেখিয়ে দেশটি জাতীয় ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক তৈরির কাজে অংশ নেবার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারী করে।

সারা বিশ্বে হুয়াওয়ের কর্মী সংখ্যা ১ লক্ষ ৪০ হাজার, যার ৭২% স্থানীয় জনগণ এবং বিশ্বের ৫০ টি সেরা টেলিযোগাযোগ অপারেটর এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানির ৪৫টির কাছে তার সেবা পৌঁছে দেয়।

এই যখন অবস্থা, তখন এর তৈরি যন্ত্রাংশের মধ্য দিয়ে যে পরিমাণ ব্যক্তিগত, সংবেদনশীল এবং সরকারী তথ্য প্রেরিত হয় তাতে বেশ কিছু দেশের সরকার চীনের সরকারের সাথে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে যে চিন্তিত হয়ে উঠবে সেতো বোঝাই যাচ্ছে।

২০১০ সালে অনুসন্ধান খ্যাত গুগল চীনা সরকারের বিরুদ্ধে তার নেটওয়ার্ক হ্যাক করার অভিযোগ করে এবং চীন থেকে সকল কার্যক্রম সরিয়ে নেয়। হ্যাকিংয়ের এর ক্ষেত্রে চীনের সফলতার কাহিনীগুলোর মধ্যে এটি একটি বলে বিবেচিত। তবে অনেকগুলো ফলাফল আসলে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হলেও এই ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের সরকার বা অন্য কোন নিয়ন্ত্রক সংস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

হুয়াওয়ে তার প্রতিবেদনে লিখেছে-
আমরা সাইবার নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করি এবং এক্ষেত্রে আমাদের কোম্পানির ক্ষমতার উন্নয়ন এবং প্রমোটের জন্য, আমাদের সহকর্মী এবং অন্যরা যেন সর্বোত্তম নিরাপত্তা আশ্বাস প্রদান করতে পারে এবং সকলের জন্য নিরাপদ এবং সুরক্ষিত সাইবার বিশ্ব নিশ্চিত করতে পারে সেজন্য বিশাল অংকের একটি বিনিয়োগ আমরা করেছি।

প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাপী নানাধরনের আইনত এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ডের কারণে যে বাধা তৈরি হয় তা দূর করার আহবান জানালেও কোন নির্দিষ্ট নিয়ম বা প্রযুক্তি নিরাপত্তা স্ট্যান্ডার্ড হাইলাইট করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বর্তমান আইন সেকেলে হবার কারণে প্রধান প্রধান হুমকিগুলো মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

"টিকে থাকার জন্য আমরা কোন দেশের ক্ষতি করি নি অথবা জাতিয় গুপ্ততথ্য, এন্টারপ্রাইজ সংক্রান্ত গোপন তথ্য চুরি করার অভিপ্রায় প্রকাশ করিনি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নিয়ম ভঙ্গ করিনি এবং এ ধরণের কোন কার্যক্রমকে আমরা সমর্থন বা বরদাস্ত করব না, আমরা এমন কোন শক্তি বা দেশকে সমর্থন করব না যারা এমন কোন কাজ করতে চায় যা অন্য কোন দেশের জন্য অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

আর দৃষ্টিকোণ থেকে, যেহেতু আমাদের দিকে বিশ্বের সবাই তাকিয়ে রয়েছে, আমাদের ক্ষমতা পরীক্ষণের জন্য আমরা অডিট এবং ইন্সপেকশন এর আহবান জানাচ্ছি।"

হুয়াওয়ের একজন প্রতিনিধি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে প্রতিবেদনটি তারা মার্কিন বা অস্ট্রেলিয়ার অখুশি সিনেটরদেরকে খুশী করার জন্য তৈরি করে নি, কিন্তু এধরণের ক্ষেত্রেও একে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে মুখপাত্রটি দৃঢ়তার সাথে বাইরের দেশ বা প্রতিষ্ঠানের উপর গুপ্তনজর রাখার ব্যাপারে চীনা সরকার এর অনুরোধ করার কথা অস্বীকার করেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির এই দাবী মানতে রাজি নন পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। তাদের ধারণা প্রতিষ্ঠানটি গুপ্তচরবৃত্তি এক সময় না এক সময় হাতেনাতে ধরা পরবে আর তখন সকল প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।