থ্রি জি/ফোর জি লাইসেন্স: "নেট নিরপেক্ষতা" অবশ্যই থাকতে হবে

zswapan's picture

অনেক অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে থ্রি জি এবং ফোর জি লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে শামুক গতিতে চলছে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। ইচ্ছা করেই আর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) লিখলাম না, কারণ বিষয়টি এখন আর তাদের হাতে নেই। তারা নীতিমালা খসড়া করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারপর সেখানে বসে বসে বয়স বাড়ছে বেচারা নীতিমালার। হয়তো এগুলো করার জন্যই সরকার বিটিআরসির হাত-পা কেটে সব ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছে। যদিও এমনটা কারও প্রত্যাশা ছিল না, তবে এ দেশে প্রত্যাশা বলে কিছু নেই। যখন যার যা প্রয়োজন, আইন এবং ক্ষমতা সেদিকেই ধাবিত হয়। এই দেশে 'জনগণের প্রত্যাশা' একটি ফালতু বিষয়।

একই সঙ্গে একই নিলামে থ্রি জি এবং ফোর জি দুটি ভিন্ন ধরনের লাইসেন্স দেওয়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। প্রচলিত নিয়মে প্রথমে আসে থ্রি জি (বা তৃতীয় প্রজন্ম) এবং এরপর ফোর জি (চতুর্থ প্রজন্ম)। সারা পৃথিবীতে এখনও ফোর-জি আদর্শ মান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনও বিভিন্ন দেশ থ্রি-জি নিয়েই কাজ চলছে। পাশাপাশি ফোর জির মূল্যও অনেক বেশি। আমাদের কিছু শহুরে মানুষ ছাড়া সেটা হয়তো কারও ক্রয়সীমায়ই থাকবে না। তারপরও দেশের মানুষ অধীর আগ্রহ নিয়ে থ্রি জি ও ফোর জি ইন্টারনেটের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা অপেক্ষা করছি, তবুও দ্রুতগতির ইন্টারনেট আসুক। কিন্তু আসছে কই?

এমন আরও বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে লিখে লাভ নেই। তাই সেগুলোর অবতারণা বৃথা চেষ্টা বলেই মেনে নিচ্ছি। তবে একটি বিষয় উল্লেখ না করেই পারছি না। সেটা ঠিকমতো না হলে পুরো জাতিকে বড়সড় একটি গোলকধাঁধার ভেতর পড়তে হবে এবং আমরা থ্রি-জি কিংবা ফোর-জি এলে দেশের মানুষের যে উন্নতির কথাগুলো বলছি, সেটা চরমভাবে ব্যাহত হবে।

সরকার লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে একটি নীতিমালার খসড়া করেছে এবং সেটা জনগণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করে রেখেছে। আমি জানি না, সেই মতামতগুলো আসলেই কতটা আমলে নেওয়া হয়। সেই খসড়া নীতিমালাটি বিটিআরসির ওয়েবসাইট থেকে ডাউনলোড করে যে কেউ পড়ে মতামত দিতে পারেন। সেই নীতিমালার খসড়াটি আমি পড়েছি এবং খুব বড় একটি বিষয় ওখানে দেওয়া হয়নি, যা জনগণের জানা থাকাটা জরুরি এবং নীতিমালাতেও যুক্ত হওয়াটা অবশ্য প্রয়োজন; সেই বিষয়টি হলো 'নেট নিউট্রালিটি'।

বিষয়টি সাধারণ মানুষ এবং উঁচু পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন হতে পারে। তবে বিষয়টি মোটেও জটিল কিছু নয়। এর পুরো নাম হলো নেটওয়ার্ক নিউট্রালিটি, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় 'নেট নিউট্রালিটি'। অনেক সময় ইন্টারনেট নিউট্রালিটিও বলা হয়ে থাকে। বাংলায় আমরা একে বলতে পারি 'নেট নিরপেক্ষতা'। পৃথিবীতে ইন্টারনেট সেবা দিয়ে থাকে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার বা সংক্ষেপে আইএসপি। বর্তমানে মোবাইল ফোন অপারেটররা হলো সবচেয়ে বড় আইএসপি। এটা বাংলাদেশে আরও বেশি করে সত্য।

এই আইএসপিগুলোর ওপর দিয়েই আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকি। এই আইএসপিগুলো ইচ্ছা করলেই অনেক সাইট বা সেবা বন্ধ করে রাখতে পারে। গ্রাহক তার ইন্টারনেটের পুরো সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আইএসপিগুলো এই কাজটি করে থাকে প্রতিযোগিতায় অসুস্থ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি অনেকেরই বুঝতে সহজ হবে। যেমন ধরুন, আপনি 'ক' নামের একটি আইএসপি থেকে ইন্টারনেট সেবা নিচ্ছেন এবং কিছুদিন পর 'খ' নামের একটি আইএসপি তাদের ওয়েবসাইটে ফ্রি ভিডিও দেখার সুযোগ দিল। আপনি 'ক'-এর একজন গ্রাহক হয়েও 'খ'-এর সেই ভিডিও দেখার অধিকার রাখেন। এটা হলো গ্রাহকের অধিকার। কিন্তু অনেক সময় প্রতিযোগিতায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার জন্য এই 'ক' আইএসপি আপনাকে সেই ওয়েবসাইট ব্রাউজ করতে বন্ধ করে রাখতে পারে। এটা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। দেখা গেল, অনেক আইএসপি থেকে সমকালের ওয়েবসাইট ব্রাউজ করা যাচ্ছে না, কারণ সেই আইএসপি এই ওয়েবসাইটের এক্সেস বন্ধ করে রেখেছে এবং সেটা তাদের নিজেদের ইচ্ছামতো; সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই। আরেকটি উদাহরণ দিই। আপনি স্কাইপ দিয়ে বিনা পয়সায় কথা বলছেন। কিন্তু একদিন একটি আইএসপি হুট করেই আপনার স্কাইপ সমর্থন করা বন্ধ করে দিল। আপনি চাইলেও স্কাইপ দিয়ে কথা বলতে পারবেন না। কিন্তু গ্রাহক হিসেবে আপনার অধিকার আছে সেটি পাওয়ার। 'নেট নিউট্রালিটি' একটি আইএসপিকে এই কাজ করা থেকে বিরত রাখে।

বিভিন্ন দেশে বড় বড় ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এমন সব বাজে কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ঠিক এমন কাজটি করে মহল্লার টিভি কেবল অপারেটররা। তারা চাইলেই একটি টিভি চ্যানেল অফ-এয়ার করে দিতে পারে। এই অনভিপ্রেত অবস্থা ঠেকানোর জন্য বিভিন্ন দেশে আইন হয়েছে 'নেট নিউট্রালিটি'। ফলে কোনো আইএসপি সরকারের অনুমতি ছাড়া গ্রাহকের কোনো সেবা (কনটেন্ট, অ্যাপ্লিকেশন, ডিভাইস, পোর্ট ইত্যাদি) নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে রহিত করতে পারবে না।

২০০০ সালের পর থেকে ইন্টারনেট অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এবং বড় বড় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের ধরে রাখার জন্য অনেক সেবা এবং কনটেন্ট বন্ধ করে রাখার প্রতিবাদে এই আইনটি তৈরি হয়। ইন্টারনেটের জনক ভিন্ট সার্ফ নিজেও এই নেট নিউট্রালিটির পক্ষে কথা বলেন। অনেক দেশেই এখন নেট নিরপেক্ষতা নীতিমালা করে দেওয়া হয়েছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে।

বড় বড় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান আরেকটি কারণে গ্রাহকের সেবা বিঘ্নিত করে থাকে। তা হলো- দীর্ঘক্ষণ গ্রাহককে ইন্টারনেটে ধরে রাখা কিংবা নিজেদের পণ্য প্রমোট করা। তারা চাইলেই একজন গ্রাহকের গতি কমিয়ে দিতে পারে এবং দীর্ঘক্ষণ ব্যবহারকারীকে আটকে রাখতে পারে কিংবা প্রতিযোগী কোম্পানির ওয়েবসাইট ধীরগতির করে দিয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটকে দ্রুতগতির করে দিতে পারে। এমন অনেক টেকনিক রয়েছে যেগুলো গ্রাহকদের ওপর প্রয়োগ করা হয়ে থাকে এবং গ্রাহকরা মুখ বুজে সেগুলো সহ্য করে যায়।

ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ইনোভেশন। একটি মানুষ সেই দিনাজপুরে বসেও তার চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারে এবং তার এলাকার, দেশের চেহারা পাল্টে ফেলতে পারে। ময়মনসিংহের একটি অজপাড়াগাঁয়ে বসেও ইউরোপ-আমেরিকার কাজ করে দিতে পারবে। এর মূল শক্তি হলো উন্মুক্ত প্লাটফর্ম। একজন গ্রাহক যদি কারও কাছ থেকে ইন্টারনেটে সেবা গ্রহণ করে থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের কোনো অধিকার নেই সেই গ্রাহকের ব্যবহারকে সংকুচিত করা (যদি না সরকার কোনো সেবা বন্ধ করে রাখতে বলে, যেমন- পর্নোগ্রাফি বন্ধ রাখা)। থ্রি জি কিংবা ফোর জি যখন আসবে, তখন ইন্টারনেটের গতি অনেক বেড়ে যাবে। সেই গতিকে কাজে লাগিয়ে যদি বান্দরবান থেকে কোনো একজন নাগরিক ইন্টারনেটে ভিডিও দেখার একটি ব্যবস্থা পরিচালনা করতে চায়, তাহলে তার সেই কাজটি করতে পারার কথা। কোনো আইএসপি সেবা বন্ধ বা ব্লক করার ক্ষমতা রাখে না।

কিন্তু এটা যদি আইন করে কিংবা নীতিমালায় দেওয়া না হয়, তাহলে নতুন বড় ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পছন্দ কিংবা অপছন্দের বিষয়গুলো বন্ধ বা ব্লক করে দিতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে গ্রাহক হিসেবে আমাদের করণীয় কিছুই থাকবে না। তাই সরকারের উচিত হবে নেট নিরপেক্ষতার বিষয়টি এই নীতিমালায় সংযুক্ত করা। এতে সাধারণ মানুষ চিন্তাশক্তি কাজে লাগিয়ে ইন্টারনেটে অনেক নতুন নতুন সেবা প্রদান করার সুযোগ পাবে। আর তখুনি দ্রুতগতির ইন্টারনেট মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।

[লেখাটি একই সাথে দৈনিক সমকালেও প্রকাশিত হয়েছে]

একই রকম আরো কিছু পোস্ট