নিল, আপনাকে নিয়ে কখনোই মাথা ঘামাইনি, কিন্তু তবুও কেন যেন বিষন্ন লাগছে

A.I.Sajib's picture

স্কুলে থাকতে একটা জিনিস খুবই বিরক্তিকর লাগতো, আর সেটা হলো মনীষীদের নাম মনে রাখা। কে বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছেন, কে কবে কী বলেছেন ইত্যাদি। এখনও সেই ঝামেলা যায়নি, কিন্তু স্কুলের কথা বলছি কারণ সাধারণ জ্ঞানে একটা প্রশ্নের উত্তর এ যাবত একাধিক পরীক্ষায় দিতে হয়েছে। সেই প্রশ্নটা হলো, চাঁদের বুকে পা রাখা প্রথম নভোচারীর নামটি কী। নিল আর্মস্ট্রং নামটা কেন যেন কখনো ভুলিনি। কেন ভুলিনি সেটা হয়তো ব্যাপক গবেষণার কোনো বিষয় নয়। প্রায়ই আমরা পার্থিব জীবন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ি আর মনে মনে ভাবি, চাঁদে গেলে হয়তো রেহাই পাওয়া যেত। যিনি সত্যিই চাঁদে গিয়েছিলেন, তাই বোধহয় তার নামটা কখনও মাথার ইনঅ্যাক্সেসিবল জোনে যায়নি।

তবে নিল আর্মস্ট্রং অ্যাপোলো ১১-এর কমান্ডার ছিলেন আর চাঁদের ভূমিতে তিনি প্রথম মানব হিসেবে পা রেখেছিলেন, এর বেশি একটা তথ্যও আমি তার ব্যাপারে জানতাম না। সত্যি কথা কি, কখনো জানার আগ্রহও বোধ করিনি। নিলকে নিয়ে কখনো কোনো ব্লগ পোস্ট লেখার দরকার হয়নি, কখনো তার প্রতি কোনো আলাদা আকর্ষণ অনুভব করিনি, কিংবা তাকে নিয়ে তেমন কোনো লেখাও কোথাও দেখিনি। সহজ কথায়, নিল আর্মস্ট্রং নামটাই কেবল মনে ছিল। সেইসঙ্গে মনে ছিল কেবল তিনটি বিষয়, “অ্যাপোলো ১১,” “Houston, we have a problem” আর “That’s one small step for man, one giant leap for mankind”।

কিন্তু টুইটারে প্রথম যখন নিল আর্মস্ট্রং এর মৃত্যু সংবাদ দেখলাম সত্যি কথা বলতে কি, প্রথমে আমি ভাবছিলাম, নিল এতদিন বেঁচে ছিলেন?! তবে সেই ভাবনাটা বেশিক্ষণ টিকলো না। নিল আর্মস্ট্রং-এর মৃত্যু, তার মৃত্যুর কারণ ও তার খুবই সংক্ষিপ্ত জীবন বিবরণী লিখতে শুরু করলাম। হয়তো লেখালেখির কাজ না করলে সেটাও করতাম না। লেখালেখির কাজ করি বলে তাকে নিয়ে একটু পড়াশোনা শুরু করলাম। জানলাম তার নৌ-বাহিনীর পাইলট থেকে চন্দ্রপৃষ্ঠে পৌঁছানো বিশ্বের প্রথম মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।

neilলেখা শেষ হয়ে গেছে। লেখা জমাও দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু মন থেকে কেন যেন নিল আর্মস্ট্রং-এর বিষয়টা যাচ্ছে না। একটা অজানা বিষণ্ণতা কোথাও জায়গা করে নিয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নিল আর্মস্ট্রংকে নিয়ে আমি কখনো মাথাই ঘামাইনি।

স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর বেশ মন খারাপ হয়েছিল যদিও আমি আজ অবধি কোনো অ্যাপল পণ্য ব্যবহার করিনি। ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া স্টিভ জবসের ভাষণ পড়লে যে কারো মনে স্টিভের জন্য সম্মান চলে আসবে। এখানে পাঠকের জন্য একটি কথা উদ্ধৃত করি। স্টিভ জবস বলেছিলেন, তিনি প্রতিদিন সকালে উঠে আয়নায় তাকিয়ে ভাবতেন, ‘আজ আমি যেসব কাজ করতে যাচ্ছি, আমি যদি কাল মারা যাবো জানতাম, তবে কি আজ সেই কাজগুলো করতাম? আর তারপর আমি আমার দিন শুরু করি।’ পরামর্শ মানা-না-মানা পাঠকের বা শ্রোতার ব্যাপার। কিন্তু পরামর্শ হিসেবে এটা নিশ্চিত অনন্য ছিল। মূলত সেই কথাগুলো মনে ছিল বলেই স্টিভ জবস মারা যাবার পর বেশ খারাপ লেগেছিল


নিল আর্মস্ট্রং, টেক্সাস, ১৯৬৯

কিন্তু নিল আর্মস্ট্রং-এর ক্ষেত্রে তেমন কিছুই ছিল না। নিল ব্যক্তি হিসেবে কেমন ছিলেন জানতাম না। এমনকি একবার মনে হলো যে নিল কেবল ভাগ্যবান একজন মানুষ ছিলেন। প্রথম পা রাখার সৌভাগ্য তার না হয়ে তার সহযাত্রী বাজ-এরও হতে পারতো। তাহলে পৃথিবীবাসী হয়তো প্রথম চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণকারী হিসেবে নীলকে নয়, বাজকে চিনতো। কিন্তু তবুও নিলের মৃত্যু বিষণ্ণ করে তোলে মন।

অনেকক্ষণ পর হঠাৎ মনে হয়, হয়তো এই বিষণ্ণতা নিল আর্মস্ট্রং-এর চলে যাওয়া নিয়ে নয়, এই বিষণ্ণতা তার “মৃত্যু”-কে নিয়ে। এই বিষণ্ণতা এই চিরসত্যকে নিয়ে যে সবাইকে চলে যেতে হবে। মানুষ হিসেবে নিল আর্মস্ট্রং-এর জীবনের তো বটেই, মানব ইতিহাসে সবারই অন্যতম সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল এই চাঁদের মাটিতে পদার্পণ করা। কেমন অনুভব করেছিলেন তখন নিল? একটা উপগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, যেখান থেকে পৃথিবীর দূরত্ব অনেক। তার সঙ্গে তার সহযাত্রী ছাড়া পুরো গ্রহটা ফাঁকা। দুর্ভাগ্যক্রমে মহাকাশযানটা গোলমাল শুরু করলে বাকী জীবনটা তাকে চাঁদেই কাটাতে হতো। কেমন সেই অনুভূতি? তখনকার প্রযুক্তি এতো উন্নত ছিল না। চাঁদে সেটা ছিল মানুষের প্রথম ভ্রমণ। কোনো একটা সিরিয়াস গোলমাল হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেই ভয়াবহ মুহূর্তটি কাটিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন পৃথিবীতে।


দুই ছেলে এবং স্ত্রীর সাথে নিল, ১৯৬৯

কিন্তু পৃথিবীতে থেকেই আর বেঁচে থাকতে পারেননি। চলে গেছেন সব অর্জনকে ত্যাগ করে অনেক দূরে।

সত্যিই। তিনি নন, তার মৃত্যুটাই বিষণ্ণতার কারণ।

neil armstrong

লেখাটির প্রথম প্রকাশ ইংরেজিতে: Dear Neil Armstrong, I Never Really Cared About You, But I Feel Kinda Sad

Tags: