ইন্টারনেট আমাদের বিভক্ত করে দিচ্ছে !

Ishtiak Khan's picture

নতুন এক অ্যালগরিদম নিশ্চিত করে জানিয়েছে - আমরা কেবল আমাদের মত চিন্তা-চেতনার লোকদের সাথে মিশছি:

আপনি যখন ভুল চিন্তা করেছেন তখন লোকজন আপনাকে সমালোচনা করে শুধরে দিয়েছে আর এর মাধ্যমে নিজেকে আপনি একজন সুদ্ধ চিন্তার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু ইন্টারনেট এক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি করছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা এমন সবার সাথে মিশছি, যারা ভিন্ন ধারার না হয়ে বরং আমাদের মত চিন্তা করতেই পছন্দ করে। ফলে আমরা “ইয়েস ম্যান”দের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে পড়ছি। এরা আমাদের প্রতিটি কথায় ইতিবাচক সাড়া দিয়ে থাকে এবং কখনই আমাদের সত্যিকারের সমালোচনা করেনা। যার কারণে আমরা ধীরে ধীরে একটি গণ্ডীর মধ্যে বন্দি হয়ে পরছি আর আমাদের চারপাশটা ভরে যাচ্ছে ইয়েসম্যানদের দ্বারা।

প্রথমে আসা যাক ফেসবুক প্রসঙ্গে, আপনার কি মনে হয় ফেসবুক আপনার সব বন্ধুদের আপডেট দেয়? না, মোটেও না, যতক্ষণ না আপনি ফেসবুক কে বলে দিবেন তার আগ পর্যন্ত এটা কেবল তাদের আপডেট দেবে যাদের সাথে আপনার লাইক বা শেয়ার বেশি। আপনার সাথে আপনার বন্ধুদের মতামতের মিলের উপর ভিত্তি করে ফেসবুক আপনার বন্ধুদের বাছাই করছে, একে কি ষড়যন্ত্র হিসেবে ধরবেন? না, এটা সাধারণ একটা কম্পিউটার অ্যালগরিদম।

প্রশ্ন হল আপনার এই ইয়েস ম্যানদের বৃত্তে বন্দী থাকার অসুবিধাটা কোথায় ?
অসুবিধাটা হল এই যে নতুন কোন চিন্তা বা কোন মতাদর্শ আপনাকে স্পর্শও করতে পারবে না, ফলে আপনার চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।

132197_0.jpg

২)গুজব দ্রুত ছড়িয়ে দেবার নতুন মাধ্যম:
শুধু প্রয়োজনীয় খবরই নয়, ইন্টারনেট অপ্রয়োজনীয় খবর ও গুঁজব ছড়াতেও অনেক বেশী পারদর্শী। আপনি কি শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারবেন যেসকল খবর আপনি ফেসবুক থেকে পান তার সবগুলো সঠিক? নিশ্চয় না। আপনি অবশ্যই এই একটি মাত্র উৎসের উপর বিশ্বাস করবেন না, কারণ প্রত্যেকটি সংবাদের মধ্যে কোথাও না কোথাও পক্ষপাতিত্ব কাজ করেছে।

132198.jpg

৩)গ্রুপের চিন্তার মেরুকরণ:
গবেষকেরা মনে করেন, মানুষ তার চিন্তায় তত বেশী স্থির হয় যত বেশী সে কোন বিষয় নিয়ে আলাপ করে। সেই হিসেবে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত সাইটগুলোতে নির্দিষ্ট নামে গ্রুপ খুলে আমরা কি করছি? কোন নতুন বিষয় নয় বরং সবার জানা একটি বিষয় এবং তথ্যের পুনরায় আলোচনা করছি। তাই না? এতে করে আমাদের চিন্তায় আরও বেশী মেরুকরণ হচ্ছে যা সবসময় সুখকর নাও হতে পারে।

৪)আমাদেরকে নেতিবাচক হতে সহায়তা করছে:
ধরুন, বড় একটি ঝুড়িতে ৬ টি সুন্দর কুকুর ছানা আছে । তাদের পাঁচটি কাউকে জ্বালাতন না করে সুন্দরভাবে গাদাগাদি করে ঘুমিয়ে আছে, আর বাকি একটি না ঘুমিয়ে এক কোনায় আপনার টিভির তার ধরে টানাটানি করছে। এবার বলুন ৬ টি কুকুর ছানার কোনটির দিকে আপনার মনোযোগ আকৃষ্ট হবে? নিশ্চয়ই পাঁজি ছানাটার দিকে। এবার আসুন, আপনি কি চুপচাপ ঘুমিয়ে থাকা ৫ টি বাচ্চাকে পৃথকভাবে ধন্যবাদ দেবেন? নাকি যেটা আপনাকে জ্বালাতন করছে তাকে সামলাবেন? অবশ্যই ঘুমন্ত বাচ্চাগুলোকে এড়িয়ে পরেরটিকেই শান্ত করবেন।

ইন্টারনেটে ঠিক এমনটিই হচ্ছে। ধরুন আপনি কেনাকাটার জন্য কোন অনলাইন শপিং সাইট এ গেলেন আপনি অবশ্যই আপনার পছন্দের পণ্য সম্পর্কে নেতিবাচক ফিডব্যাক দেখলে তা নিতে আগ্রহী হবেন না। কিন্তু ভাবুন তো অনলাইনে আগের কেনা কয়টি ভালো পণ্য সম্পর্কে আপনি নিজে ঐ সাইটে ইতিবাচক ফিডব্যাক দিয়েছেন? যদি পণ্যটি ভালো হয় তখন গ্রাহক তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে এবং এই সন্তুষ্টির কথা সে সাধারণত কাউকে বলে না। আরও বলা যেতে পারে আপনি আপনার বসের কথায় তখন বেশী মনযোগী হবেন যখন তার মেজাজ বেশী খারাপ থাকে। এভাবে আমরা ক্রমশ নেতিবাচক চিন্তায় আসক্ত হচ্ছি তাই নয় কি?

৫) ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং বাকি সবার মাঝে সৃষ্ট দূরত্ব:
ইন্টারনেট ব্যবহার করা এবং না করা লোকদের মাঝে “ডিজিটাল বিভেদ” তৈরি হয়েছে। চোখ বুজে একবার শৈশবে ফেলে আসা বন্ধুদের কথা ভাবুন, এদের কয়জনের সাথে আপনার বন্ধুত্ব রয়েছে, আর তাদের মধ্যে কয়জন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। দেখা যাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের সাথে কেবল তাদেরই যোগাযোগ রয়েছ যারা এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। বাকীদের সাথে যোগাযোগ হয় না বললেই চলে। এভাবে আমরা ইন্টারনেট কে এক এবং একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যমে পরিণত করছি। ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ও বাকীদের মাঝে বিশাল দূরত্বের সৃষ্টি হচ্ছে।

এই লেখনীর সাহায্যে ইন্টারনেট এর ক্ষতিকর দিক নয় বরং আমাদের মানুষিকতার ক্ষতিকর দিক গুলো তুলে ধরতে চেষ্টা করা হয়েছে।

Tags: