উইন্ডোজ এইট প্রেমীদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা, এবং সন্দেহ জাগ্রত হয়েছে!

ইকবাল আহসান's picture

উইন্ডোজ ৮ প্রেমীদের মধ্যে ওএসটি সম্পর্কে ভয়, অনিশ্চয়তা, এবং সন্দেহ জাগ্রত হয়েছে। মাইক্রোসফটের প্রাক্তন কর্মী এবং ভালভ সফটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গেব নিউওয়েল বলেন, "আমি মনে করি উইন্ডোজ ৮ পিসি জগতে সকলের জন্য বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিবে।"

হাফ-লাইফ এর মত গেম ও উইন্ডোজ এবং ম্যাক ওএস টেন এর জন্য স্টিম গেম অবকাঠামো নির্মাতা হিসেবে পরিচিত ভালভ সফটওয়্যার। প্রতিষ্ঠানটি স্টিম গেম অবকাঠামোটিকে এখন লিনাক্স সমর্থক করার চেষ্টায় রয়েছেন। আর এই প্রেক্ষিতে তিনি আরো বলেন, "লিনাক্সের ক্রমাগত উন্নতির জন্য আমরা একান্তভাবে কাজ করে চলেছি।...আমরা লিনাক্সের পরিবেশকদের সাথে কাজ করে যাবো, তাদের কাছে স্টিমকে পৌঁছে দেবার জন্য, আমাদের গেমগুলো পৌঁছে দেবার জন্য, এছাড়া অন্য যারা আমাদের সাথে কাজ করবে তাদের গেমগুলো স্টিম এ দেবার জন্য এবং লিনাক্সে সেগুলো চালানোর জন্য পদ্ধতিটিকে যতটা পারা যায় ততটা সহজ করে আনবো। এটা আমাদের কৌশল।"


এই ট্যাবলেট তৈরির ঘোষণা দিয়ে পিসি নির্মাতাদের আতে ঘা দিয়েছে মাইক্রোসফট

আর এই কথাগুলো তিনি উল্লেখ করেন উইন্ডোজ এইট সম্পর্কে সমালোচনা করার আগে!

এড ফ্রাইজ (আরেক জন মাইক্রোসফটের প্রাক্তন কর্মকর্তা) এর কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথাগুলো বলেন গেব নিউওয়েল।

তার মতে মাইক্রোসফট খুব শীঘ্রই শীর্ষস্থানীয় কিছু পিসি নির্মাতাকে হারাবে। এই নির্মাতারা বাজার ছেড়ে চলে যাবে এবং কিছু লোক লভ্যাংশ হারাবে। আর তার এ ধারণা যদি সত্যি হয়, তাহলে বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে এদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য নতুন একটি অবকাঠামো নিয়ে কাজ করা।

প্রযুক্তি জগতে মাইক্রোসফটের নতুন ওএস নিয়ে যত জল্পনা কল্পনা চলছে। আর এই জল্পনা-কল্পনাগুলো লক্ষ্য করলে মনে হয় এ যেন উইন্ডোজ এইট মুক্তি নয় বরং আগামী নির্বাচনে কে জিতবে এরকম একটা ব্যাপার। এটা যেন কম্পিউটার ওএস নয় বরং যুদ্ধ জয়ের একটা ব্যাপার, "উইন্ডোজ এইট বিশ্বাসঘাতক! ভবিষ্যতে লিনাক্সের জয় অবধারিত!"

তবে এটা ঠিক মাইক্রোসফট বর্তমানে কোণঠাসা অবস্থাতেই রয়েছে। অবশ্য এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে -

এক) পিসি নির্মাতারা পুনর্বিবেচনা করছে - উদ্দেশ্যহীনভাবেই হোক বা গুরুতর ভাবেই হোক, মাইক্রোসফটের সাথে থাকবে কিনা তা পুনর্বিবেচনা করছে তারা - না এর জন্য ওএসটি দায়ী নয়। বরং দায়ী মাইক্রোসফট ব্র্যান্ডের সার্ফেস ট্যাবলেটটি। মাইক্রোসফটের হার্ডওয়্যার তৈরির সিদ্ধান্তে নাখোশ তারা। এর সাথে নতুন ওএস এর কোন সম্পর্কে নেই।

দুই) সনাতন পন্থি এবং বেশ কিছু ব্যবহারকারী মেট্রো ইন্টারফেসটি পছন্দ করছে না; মূলত এরা সেই শ্রেণীর মানুষ যারা সহজে কোন পরিবর্তন পছন্দ করে না। আর এরাই হাও-কাওটা একটু বেশি করছে।

এখানে বলে রাখা ভালো, প্রিয় টেকে আমরা বর্তমানে পরীক্ষা মূলক ভাবে সবগুলো পিসিতেই উইন্ডোজ এইট ইনস্টল করেছি এবং আমরা সবাই নতুন ওএসটির কর্মদক্ষতায় খুশী। মেট্রো ইন্টারফেসটিও চমৎকার বলে মনে হয়েছে আমাদের কাছে।

তিন) মেট্রো এবং উইন্ডোজ স্টোর - যার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের ব্যবহারকারীরা অ্যাপ্লিকেশন ইনস্টল করবে। আইডিসি'র বিশেষজ্ঞ 'যে চাও' এর মতে এর কারণে মাইক্রোসফটের উন্মুক্ততা একটু ব্যাহত হতে পারে।

আর এই অনুযোগগুলোকে (বিশেষ করে এক নাম্বারটির ক্ষেত্রে) যেন আরো উস্কে দেবার জন্য মাইক্রোসফট বাৎসরিক প্রতিবেদন জমা দেবার সময় যখন ঘোষণা দিল "আমাদের সার্ফেস ডিভাইস আমাদের ওইএম অংশীদারদের তৈরি করা পণ্যের সাথে পাল্লা দিবে, যা তাদেরকে আমাদের অবকাঠামোর উপর আস্থা রাখার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করতে পারে।"

আর এ ধরণের কণ্টকিত বিবৃতি যখন সরাসরি মাইক্রোসফটের কাছ থেকে আসে তখন একে প্রশমিত করার মত বাক্য খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবে মাইক্রোসফটের কঠোর হবার কারণ রয়েছে- প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার হিসেবে যারা পরিচিত তারা কিন্তু সবাই এখন অন্য অবকাঠামো নিয়ে কাজ করে, এরা কিন্তু কেউ ১০০% মাইক্রোসফট নির্ভর নয়। যেমন ধরুন-

  • ডেল - লিনাক্স এবং অ্যানড্রয়েড ভিত্তিক ডিভাইস তৈরি করে।
  • অ্যাসার - অ্যানড্রয়েড ভিত্তিক ডিভাইস তৈরি করে।
  • এইচপি - নিজেরাই ওএস তৈরি করার চেষ্টা করেছে(WebOS)
  • লেনোভো - অ্যানড্রয়েড ভিত্তিক ডিভাইস তৈরি করে।
  • অ্যাসাস - অ্যানড্রয়েড ভিত্তিক ডিভাইস তৈরি করে।
  • তোশিবা - অ্যানড্রয়েড ভিত্তিক ডিভাইস তৈরি করে।

এই সকল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনোভোর থিঙ্কপ্যাড এর মান সবচেয়ে ভালো, ডেল এর এক্সপিএস এক সময় খুব ভালো মানের হলেও এখন কিছুটা নেমে এসেছে আর এইচপি ভালো, খারাপ নির্ভর করে কোন দেশ থেকে পণ্যটি কিনছেন তার উপর। আর এই সকল কারণে মাইক্রোসফট এবার কঠোর হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তাহলে, ভয়, অনিশ্চয়তা, এবং সন্দেহ কি থেকে যাবে? না বরং আরো বৃদ্ধি পাবে। উইন্ডোজ এইট বের হবার দিন যত ঘনিয়ে আসবে এই ধরণের আশঙ্কা আরো বৃদ্ধি পাবে। মাইক্রোসফট তার ওএসটিতে যতবার বিশাল পরিবর্তনের জন্য শক্ত হয়েছে ততবার প্রযুক্তি পণ্ডিতেরা তাকে আঘাত করেছে আর ব্যবহারকারীরা করেছে বিদ্রোহ। ধরুন এই আমিই উইন্ডোজ ২০০০ থেকে এক্সপিতে স্থানান্তরিত হয়েছি বের হবার দুই বছর পর। তার আগ পর্যন্ত আমার কাছে উইন্ডোজ এর পুরনো মেন্যুগুলোই বেশি পছন্দ ছিল!

তবে মাইক্রোসফটের জন্য এবারের পরিস্থিতিটা একটু ভিন্ন, আর এর কারণ সেই একই সার্ফেস। অনেকে ভাবতে পারেন হার্ডওয়্যার না বানালেই তো মিটে গেল। উইন্ডোজ থেকে তো কম আয় করছে না মাইক্রোসফট। না তা ঠিক নয়, বরং মাইক্রোসফট যদি সদা পরিবর্তনশীল এই প্রযুক্তি জগতে টিকে থাকতে চায় তাহলে সার্ফেস তার দরকার। এক্ষেত্রে মাইক্রোসফটের উচিত অ্যাপল এবং গুগলের কৌশল অনুসরণ করা। ফর্বস ব্লগে ভেঙ্কাটেশ রাও বলেন, গুগল জেতার জন্য "মাইক্রোসফট প্রথম দিকে জেতার জন্য যে কৌশল অনুসরণ করেছিল তা অনুসরণ করছে" উন্মুক্ত ওএস লেয়ার, প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ইত্যাদির সাহায্যে গুগল "মাইক্রোসফটের পদ্ধতিতেও মাইক্রোসফটকে পরাজিত করছে।"

তাহলে বিপর্যয় কি নেমে আসছে?

পিসি নির্মাতা এবং ব্যবহারকারী উভয়েই যদি মাইক্রোসফটকে ছেড়ে চলে যায় তাহলে ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিপর্যয় হিসেবে অবশ্যই দেখা দিবে।

মুর ইনসাইটের প্রধান বিশ্লেষক প্যাট মুরহেড এ ব্যাপারে তার মন্তব্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "দীর্ঘ মেয়াদী, মাইক্রোসফটের বিকল্প কিছু পেতে হবে সে সম্পর্কে ধারণা পিসি নির্মাতাদের রয়েছে। তা গুগলের অ্যানড্রয়েড হতে পারে অথবা উন্মুক্ত অবকাঠামো লিনাক্স হতে পারে। কিন্তু এই দুই বিকল্প অবকাঠামো ওইএম নির্মাতাদের জন্য এখন পর্যন্ত কিছু করে নি, কিন্তু অ্যানড্রয়েড এর ক্ষেত্রে, ভোক্তা অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর বাস্তুতন্ত্র বৃদ্ধি পাচ্ছে সেহেতু মোবাইল ওএস হওয়া সত্ত্বেও এটি বাস্তবিক অর্থে মাইক্রোসফটের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।"

সম্ভাব্য পরিস্থিতি হিসেবে আমরা মুরহেডের কঠিন বাস্তবতা আর নিউওয়েলের বিপর্যয় আশঙ্কার মাঝামাঝি কোন অবস্থা হিসেবে ধারণা করতে পারি। কিছু পিসি নির্মাতা হয়তো নতুন কোন অবকাঠামোটি নিয়ে কাজ শুরু করবে আর কিছু ব্যবহারকারী অ্যানড্রয়েড অথবা অ্যাপল অবকাঠামোতে ঝাঁপ দিবে। কিন্তু তাই বলে বিপর্যয় নেমে আসবে এটা মনে করতে নারাজ আমি। সত্যি কথা বলতে কি আমি উইন্ডোজ এইট এবং সার্ফেস পণ্যের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছি। উইন্ডোজ এইট পিসি এবং ট্যাবলেট ব্যবহারে নতুনত্ব সৃষ্টি করবে যা ব্যবহার করতে আগ্রহী বিশ্বের লাখো মানুষ।

সার্ফেস এর প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারেও এখানে কিছু বলে নেয়া দরকার বলে আমি মনে করছি। মাইক্রোসফট সবসময় ওএস বা সফটওয়্যার নির্মাণ করে এসেছে। হার্ডওয়্যারের ব্যাপারে তারা কখনো মাথা ঘামায় নি। আর এই সুযোগটাই গ্রহণ করেছ অ্যাপল। হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অনন্য ডিজাইন এর ম্যাক তৈরি করে ক্রেতা আকৃষ্ট করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একটা সময় ছিল যখন মাইক্রোসফট এর মেশিনগুলো ছিল বাক্সের মত, অন্যতম পিসি নির্মাতা ডেলকে বলা হত 'বেইজ বক্স মেকার'। কারণ একঘেয়ে একরঙা পিসি নির্মাণ করতো তারা। আজ এত বছর পরেও সেক্ষেত্রে নতুন কিছু আসেনি। উইন্ডোজ মেশিনের সংখ্যা কিন্তু কম নয়, কিন্তু তার পরেও দেখুন এমন একটা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ পাবেনা না যেটি অ্যাপলের পণ্যের ধারের কাছে যায়।

কারণ, সেই পুরাতন কিভাবে অল্প পরিশ্রমে বেশি অর্থ আয় করা যায়। প্রায় একদশক পর মাইক্রোসফট তার ভোক্তাদের জন্য একটা ভালো কিছু তৈরি করলো আর তখনই এই পিসি নির্মাতারা মাইক্রোসফট ছেড়ে দেবার হুমকি দিল! হুমকি দেবার চাইতে ভালো কোন পণ্য তৈরি করে দেখানোই কি বুদ্ধিমানের কাজ নয়?

যেখানে লাখো মানুষ নতুন ওএসটি ব্যবহারের জন্য অপেক্ষা করে আছে সেখানে উইন্ডোজ এইট মাইক্রোসফটের ক্ষেত্রে বিপর্যয় ঘটাবে সেটা ভাবা ঠিক নয়। খুব বেশি হলে ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমে যাবে।