ডিজিটাল বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অবস্থান

প্রতিবন্ধিতা শব্দটির সঙ্গে কম-বেশি আমরা সকলেই পরিচিত। প্রতিবন্ধীরা আমাদের সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিন রাস্তা-ঘাটে, অফিস-আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদেরকে আমরা দেখছি। দয়া-দাক্ষিণ্য আর করুণার গণ্ডিতে তাদেরকে আবদ্ধ রাখছি। কিন্তু তাদের স্বনির্ভরতার মাধ্যমে উন্নত জীবনযাপনের পন্থা কি হতে পারে তা কি কখনো ভেবে দেখেছি?
দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরাও প্রতিবন্ধিতার আওতাভুক্ত। বর্তমানে বাংলাদেশে বেশ অনেকগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছে: এদের মধ্যে BVIPS, VTCB, BODA, BERDO, IHMSM, CSF ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ উল্লেখযোগ্য। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কম্পিউটার প্রশিক্ষণ বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকে। এ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের মাধ্যমে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কম্পিউটার ব্যবহারের প্রাথমিক জ্ঞানসহ MS Word, Power Point Internet ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করে।

এ দক্ষতাগুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা ও খরচ কমানোসহ কর্মসংস্থানের চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কম্পিউটার অপারেটর, রিসিপশনিস্ট প্রভৃতি পদে সফলতার সাথে কাজ করছে। পড়াশোনার ক্ষেত্রে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা ছাপানো বা হাতে লেখা যে কোন কাগজ স্ক্যান করে JAWS সম্বলিত কম্পিউটারের মাধ্যমে পড়ে ফেলছে (JAWS) এমন একটি সফটওয়্যার যা যে কোনো লেখা কণ্ঠের মাধ্যমে পড়ে শোনায়। প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশিক্ষণার্থীদের যাতায়াতের ভাড়াও প্রদান করে থাকে। শত শত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এ প্রোগ্রাম, সম্পন্ন করে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু এ চিত্রটি শুধুই আমাদের ঢাকা শহরের।
ঢাকার বাইরে কোথাও কোনো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে এমনটি শোনা যায়নি। অর্থায়ন, পর্যাপ্ত লোকবল ও মনিটরিং-সুপারভিশনের অভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও খুব বেশি কিছু করতে পারছে না। অচল ও পুরনো মডেলের কম্পিউটার, ঘন ঘন লোডশেডিং, উপযুক্ত প্রশিক্ষকের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। প্রোগ্রামগুলোর সময়ও প্রয়োজনের তুলনায় কম। যেহেতু স্বাভাবিকদের তুলনায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিখতে ও বুঝতে সময় বেশি লাগে সেহেতু প্রতিদিনের ক্লাস ঘণ্টা ও প্রোগ্রামের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদী কোর্সগুলো যেহেতু কার্যকর হচ্ছে না ফলশ্রুতিতে তারা একটি কোর্স সম্পন্ন করে আরেকটি কোর্সের পেছনে ছুটছে। উপরোক্ত অধিকাংশ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের নিজস্ব কম্পিউটার না থাকায় শেখা দক্ষতাগুলোও তারা ভুলে যাচ্ছে। পরিণামে, এক কেন্দ্র থেকে আরেক কেন্দ্রে ছোটাছুটিই সার হচ্ছে। এ প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসাবে কাজ করছে উপযুক্ত সফটওয়্যারের অভাব।
প্রচলিত JAWS সফটওয়্যারটি ইংরেজি পড়ার ক্ষেত্রে কার্যকরী হলেও বাংলা পড়া, কাঠামো ও ছবি শনাক্তকরণসহ বাধাহীনভাবে ইন্টারনেট ব্রাউজিঙের ক্ষেত্রে কার্যকরী নয়। বাংলা পড়ার ক্ষেত্রে একটি ন্যূনতম কার্যকরী সফটওয়্যার রয়েছে, রয়েছে যার নাম ‘কথা’। কিন্তু এ সফটওয়্যারটি এতই দুর্বল যে এর সাহায্যে সুষ্ঠুভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। আবার বাংলা ও ইংরেজি পড়ার জন্য আলাদা আলাদা সফটওয়্যার ব্যবহার ঝামেলাপূর্ণ। JAWS এবং কথা বাংলাদেশে সহজলভ্যতা নয়। JAWS-এর আসল ভার্সনটি ব্যয়বহুল বিধায় সকল ক্ষেত্রেই-এর পাইরেটেড কপি ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ এসব বিষয় দেখার কেউ নেই।
বর্তমান সরকার ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন আনয়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে জোরদার করে তাদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রচেষ্টা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের একটি সোপান হতে পারে বলে মনে করি। সরকার যদি দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শেখার সুযোগ রাখে এবং ইংরেজি ও বাংলাসহ ছবি ও কাঠামো পড়তে পারে এমন একটি পূর্ণাঙ্গ সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ নেয় যেটি সকল কম্পিউটারে ইনস্টল করা বাধ্যতামূলক হবে, তাহলে দেশের সকল অঞ্চলের দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন করতে পারবে। এ মহতী ও যুগোপযোগী উদ্যোগ সমাজের অবহেলিত ও করুণার পাত্র হিসাবে বিবেচিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেও কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।
লেখক: শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সৌজন্যে: ইত্তেফাক
- রায়হান আরা জামান's blog
- Login or register to post comments










