লিনাক্স সংক্রান্ত "কুসংস্কার" ঝেড়ে ফেলার সময় কি আসে নি?

অনিরুদ্ধ অধিকারী's picture

"লিনাক্স" শব্দটি শুনলেই বুকের ভেতর হঠাৎ করে কেমন যেন করে ওঠে, ঠিক যেন সাক্ষাৎ শ্যাওড়া গাছের ভূত, কিংবা তার চেয়েও ভয়ংকর কিছু! শ্যাওড়া ভূতের মত লিনাক্সকে নিয়ে কেন্দ্র করে ওঠা গুজব, ভয় ইত্যাদিরও অভাব নেই আজ। লিনাক্স সম্পর্কে আপনাদের ধারণা বদলে দেবার চেষ্টা করার পূর্বে বলার চেষ্টা করি লিনাক্স মূলত কি এবং এর কাজ কি।

aলিনাক্স মূলত একটা মূলধারার অপারেটিং সিস্টেম ফ্যামিলি, বা পরিবার। "লিনাক্স" নামের একটি ভিত্তির (Core) এর ওপর শত শত অপারেটিং সিস্টেম তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে, এসকল অপারেটিং সিস্টেমকে বলা হয় "লিনাক্স ডিস্ট্রিবিউশন", যাকে আমরা আদর করে ডাকি "লিনাক্স ডিস্ট্রো"। বর্তমানে বহুল পরিচিত লিনাক্স ডিস্ট্রোসমূহের তালিকায় রয়েছে উবুন্টু, লিনাক্স মিন্ট, ডেবিয়ান, ফেডোরা, স্যুসে, রেডহ্যাট ইত্যাদি। উইন্ডোজ এক্সপি/ভিস্তা/৭ কিংবা ম্যাক ওএস টেনের মত এগুলো প্রত্যেকটিই স্বতন্ত্র অপারেটিং সিস্টেম, কিন্তু এরা সহোদর কারণ এদের জন্ম একই লিনাক্স কার্নেল থেকে। অন্যান্য অপারেটিং সিস্টেমের থেকে এসকল সিস্টেমের পার্থক্য অনেক। তন্মধ্যে একটি হল এগুলোর সবই বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য এবং এদের প্রায় সব অ্যাপ্লিকেশনের সোর্স কোড উন্মুক্ত।

এবার লিনাক্স সংক্রান্ত কিছু কুইক ফ্যাক্টস দেখে নিই।
১। লিনাক্সের ডেভেলপমেন্টের সাথে প্রায় ৮০০টি কোম্পানি ও ৮০০০ জন ডেভেলপার যুক্ত, ডেভেলপারদের অনেকাংশই স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিকে কাজ করে। (এটি শুধু Core এর ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে, অন্যান্য অংশের কথা বাদ দিলাম!)
২। গুগল অ্যানড্রয়েড ও ক্রোম ওএস লিনাক্স ডিস্ট্রো।
৩। লিনাক্স ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিউক্লিয় চেইন বিক্রিয়ার মত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহারের দৃষ্টান্ত পাবেন এখানে
৪। আইবিএম, ওরাকল, গুগল, স্যামসাং, ইন্টেল নিয়মিতভাবে লিনাক্সের ডেভেলপমেন্টে অংশ নিচ্ছে।
৫। গুগল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে Goobuntu নামের একটি লিনাক্স ডিস্ট্রো তৈরি করে ব্যবহার করছে।

মিথবাস্টার!

মিথ ১: লিনাক্সে কমান্ড লিখে কাজ করতে হয়।
উত্তর: উত্তরটি ছবির সাহায্যে দিয়ে দিলাম। লিনাক্সের জন্য অনেক অনেক গ্রাফিক্যাল কাজ করার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কমান্ড লিখে কাজ করার পরিবর্তে মাউসের ক্লিকেই প্রায় সব সাধারণ কাজ করা সম্ভব।

মিথ ২: মানলাম গ্রাফিক্যাল ইন্টারফেস আছে, কিন্তু উইন্ডোজের মত তো "সুন্দর" না!
উত্তর: সৌন্দর্যের বিষয়টা আপেক্ষিক, যা আপনার কাছে ভালো লাগে, আমার কাছে নাও লাগতে পারে। উইন্ডোজ ৭ এর তুলনায় উবুন্টু ১২.০৪ এর ইন্টারফেস আমার কাছে অধিক আকর্ষণীয় মনে হয়। লিনাক্স ডিস্ট্রোগুলোর একটি মজার ব্যাপার হল আপনি একটি মাত্র ডেস্কটপ পরিবেশে সীমাবদ্ধ নন, GNOME, KDE, XFCE, Unity, LXDE, MATE, Cinnamon ইত্যাদি অনেক ডেস্কটপ পরিবেশ আছে, যাদের চেহারা ও কাজ করার ধারা আলাদা। প্রত্যেকটি ডেস্কটপ পরিবেশকে আবার থিম, ওয়ালপেপার ইত্যাদি দিয়ে আরও সাজানো সম্ভব! (উইন্ডোজ ৭ এর ইন্টারফেসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল রয়েছে KDE এর।) আর ঝাকানাকা কম্পিজ ইফেক্টগুলো না দেখলে...।

মিথ ৩: লিনাক্স ইন্সটল করলে হার্ডডিস্কের ডাটা গায়েব হয়ে যায়!
উত্তর: প্রত্যেকটি অপারেটিং সিস্টেম ইন্সটল করার পূর্বে পার্টিশনিং করে নিতে হয়, এখন পার্টিশনিংয়ের সময় Forward চেপে চেপে স্ক্রিনে কিছু না পড়ে অন্ধের মত কাজ করলে তো এই হাল হওয়া বাধ্যতামূলক! আপনাকে তো জিজ্ঞেসই করা হয় পুরো হার্ডডিস্ক ফরম্যাট করবেন কিনা, ওইসময় যদি Yes বলে এগিয়ে যান, তাহলে তো লিনাক্সের দোষ দিয়ে লাভ নেই ভাই (বা বোন)! (পার্টিশনিংয়ের একটি সুন্দর বাংলা টিউটোরিয়াল)।

মিথ ৪: লিনাক্সে কোন সফটওয়্যারই নেই, কাজ করব কি দিয়ে?
উত্তর: লিনাক্স কমিউনিটির ম্যাচুরিটি সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। কমার্শিয়াল এবং স্বেচ্ছাশ্রমে লেখা অনেক সফটওয়্যার রয়েছে আপনার চাহিদা মেটানোর জন্য, যার সামান্য তালিকা এখানে। এছাড়াও Wine এবং CrossOver এর সাহায্যে উইন্ডোজের সফটওয়্যার লিনাক্সে চালানো সম্ভব।

মিথ ৫: লিনাক্সে তো কোন গেমই নাই, কম্পিউটার কিনেছি কি জন্যে!
উত্তর: আগের উত্তরে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নিন। :-)

মিথ ৬: লিনাক্স যদি এত ভালো হতো, তাহলে এত কম মানুষ ইউজ করতো?
উত্তর: একবার ভাবুন তো, আপনার মনে লিনাক্স সংক্রান্ত কতগুলো মিথ্যে কথা স্থান করে নিয়েছিল এবং সেগুলো কিভাবে লিনাক্সের প্রতি আপনার ভীতি সৃষ্টি করেছে এবং লিনাক্স চালিয়ে দেখা থেকে আপনাকে বিরত রেখেছে? বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতিটি দেশে আস্ত লিনাক্স ব্যবহারকারী কমিউনিটি রয়েছে, যারা পরস্পরকে বিভিন্ন সমস্যায় সহায়তা করছে এবং নিয়মিত এর প্রচার প্রচারণায় অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়

মিথ ৭: লিনাক্স বেশি ব্যবহারকারী পেলেই তো কমার্শিয়াল হয়ে যাবে? তখন?
উত্তর: লিনাক্স ও এর অধিকাংশ সফটওয়্যার GNU General Public License এর অধীনে ছাড়া হয়েছে এবং এগুলোর সোর্সকোড উন্মুক্ত। লিনাক্সের সোর্সকোড আপনি চাইলে এখনি ডাউনলোড করে নিতে পারেন। সোর্সকোড উন্মুক্ত থাকার কারণে আপনি চাইলেই সোর্স সংগ্রহ করে সেটি রিলিজ করে পারেন, যদিওবা লিনাক্স কমার্শিয়াল হয়ে যায়। আর ঘটনাটি ঘটার সম্ভাবনা প্রায় নেই, কারণ লিনাক্সের ডেভেলপমেন্ট মডেল ট্র্যাডিশনাল ক্লোজড মডেলের সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেকগুলো কোম্পানির প্রোগ্রামার ও স্বেচ্ছাসেবকেরা একত্রে লিনাক্সের ডেভেলপমেন্ট করছে, এখানে কোন একক কোম্পানি লিনাক্সের মালিক নয়।

মিথ ৮: লিনাক্স তো মাগনা, মানে ফ্রি। আর ফ্রির জিনিস কি কোনোদিন ভালো হয়?
উত্তর: ফায়ারফক্স, ফ্রি মানে বাজে, অভ্র কীবোর্ড ফ্রি, অর্থাৎ এটি জঘন্য সফটওয়্যার। আসলে লিনাক্সের মত এগুলো শুধু ফ্রিই নয়, সেই সঙ্গে ওপেন বা উন্মুক্ত। উন্মুক্ত সফটওয়্যারের ডেভেলপমেন্ট কমার্শিয়ালি ও স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। তাই এগুলো সাধারণত বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।

মিথ ৯: লিনাক্সে কোন মডেমই কাজ করে না, ফালতু অপারেটিং সিস্টেম!
উত্তর: কিছু নিম্নমানের চীনা মডেম কাজ করে না ঠিকই, কিন্তু বহুল প্রচলিত EDGE বা GPRS মডেম এবং হ্যান্ডসেটসমূহ ঠিকই কাজ করে। এছাড়া বাংলালায়ন ও কিউবির ইউএসবি মডেম লিনাক্সে চালানো সম্ভব (ইনডোর ইউনিট তো বটেই!)

মিথ ১০: লিনাক্সে বাংলা লেখার জন্য বিজয়, অভ্র কিছুই নাই!
উত্তর: লিনাক্সে বিজয়, অভ্র, প্রভাত, ইউনিজয়, জাতীয়, মুনীর সব কীবোর্ডই আছে, চাইলে নিজেও একটা লেআউট বানিয়ে নিতে পারেন! উইন্ডোজের ফন্টগুলো সরাসরি এখানে ইন্সটল ও ব্যবহার করা যায়।

মিথ ১১: লিনাক্সে গান শোনা, ভিডিও দেখা কিছুই তো করা যায় না, ভুয়া!
উত্তর: আইনি জটিলতার জন্য কিছু লিনাক্স ডিস্ট্রোর সাথে মিডিয়া কোডেক দেয়া থাকে না, সেক্ষেত্রে আপনাকে তা ম্যানুয়ালি ইন্সটল করে নিতে হয়।

মিথ ১২: লিনাক্স সাধারণ মানুষের জন্য না, এটি প্রোগ্রামাররা ব্যবহার করে! (আর আমি প্রোগ্রামার না)
উত্তর: লিনাক্স যদিও শুরুতে অ্যাডভান্সড কাজের জন্য শুরু করা হয়েছিল এবং লার্জ হাড্রন কোলাইডারের মত প্রজেক্টে লিনাক্সই সুপার কম্পিউটারগুলো পরিচালিত করে, তথাপি বর্তমানে লিনাক্সকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের উপযোগী করার জোর প্রচেষ্টা চলছে এবং এই চেষ্টা অনেকাংশে সফল। আর হ্যাঁ, লিনাক্স চালাতে প্রোগ্রামার হওয়া লাগে না, মাউস নাড়াতে আর কীবোর্ড চাপতে পারার জ্ঞানের পাশাপাশি সামান্য কাণ্ডজ্ঞান যথেষ্ট।

মিথ ১৩: লিনাক্সের সিকিউরিটি দুর্বল, মাগনা জিনিসের আবার...
উত্তর: সার্ভার ফার্মগুলোতে লিনাক্স চলার অন্যতম কারণ হল এর সিকিউরিটি। এতে ইউনিক্সের শক্তিশালী ফাইল পারমিশন মডেল ও কার্নেল লেভেলে ফায়ারওয়ালসহ আরও অনেক ধরণের নিরাপত্তা বিল্ট-ইন থাকে। তাছাড়া, লিনাক্সের এ পর্যন্ত তেমন কোন ভাইরাস তৈরিই হয় নি, যা হয়েছে, তা প্রাগৈতিহাসিক কালে গায়েব হয়ে গেছে। উইন্ডোজের ভাইরাস কোনক্রমেই লিনাক্সে চলবে না, Wine বা CrossOver থাকলেও ওই ভার্চুয়াল স্যান্ডবক্সের মধ্যে চিপায় পড়ে যাবে, মূল সিস্টেমের ধারে কাছে ঘেষতে পারবে না। আর ওপেনসোর্স হওয়ায় কোন নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি পেলে অভিজ্ঞ প্রোগ্রামাররা সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে ঠিক করে ফেলতে পারেন এবং আমাদের কাছে আপডেট আকারে পাঠিয়ে দিতে পারেন।

আর লিনাক্সের এন্টিভাইরাসের কথা বলবেন তো? লিনাক্সের এন্টিভাইরাস আছে, কিন্তু সেগুলো লিনাক্স সিস্টেমকে রক্ষা করে না (করবে টাই বা কীসের থেকে?) বরং সার্ভারে থাকা ফাইলে ভাইরাস ডিটেক্ট করে উইন্ডোজ ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা দেয়াই লক্ষ্য!!!

মিথ ১৪: লিনাক্সে কোন সমস্যা হলে আমাকে কে সাহায্য করবে, তুমি?
উত্তর: সম্ভব হলে করবো। এটিই তো লিনাক্স কমিউনিটির মূলমন্ত্র, এভাবে পারস্পরিক সাহায্যের মাধ্যমেই লিনাক্স ব্যবহারকারীরা বিশ বছর অতিক্রম করেছে। গুগলে সার্চ করলেই এখন প্রায় যেকোনো সমস্যার রেডিমেড সমাধান পাওয়া যায়, আর বাংলাদেশে বাংলাভাষী লিনাক্স ব্যবহারকারীদের আলাদা একটি ফোরামই রয়েছে, যেখানে যে কেউ নিবন্ধন করে সাহায্য দিতে, বা পেতে পারেন। লিনাক্স শুরু করার জন্য একটি চমৎকার রিসোর্স হল অভ্রনীলের "সহজ উবুন্টু শিক্ষা"।

লিনাক্সের বিবর্তন প্রতি মুহূর্তে হচ্ছে, প্রাচীন ধারণা দিয়ে এর প্রতি বিরূপ মনোভাব নিয়ে বসে থাকা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। আশা করছি একবার হলেও কোন একটি লিনাক্স ডিস্ট্রোর (আমি উবুন্টুর জন্য ভোট দিলাম) স্বাদ নিয়ে দেখবেন! সময় স্বল্পতার জন্য আমার লেখা আর দীর্ঘায়ত করতে পারলাম না। ধন্যবাদ সকলকে।

Tags: