ইমাজিন কাপে আমাদের ভবিষ্যৎ

যদিও পিপল'স চয়েস অ্যাওয়ার্ড একটা সান্ত্বনা পুরষ্কার ছাড়া কিছুই নয়। দুর্ভাগ্যজনক হল, এদেশের অনেকেই মনে করেন পিপল'স চয়েস অ্যাওয়ার্ড হল ইমাজিন কাপের একমাত্র পুরষ্কার, যেটা অনলাইন ভোটে এগিয়ে থাকা দলকে দেয়া হয়। অথচ, ৮টি মূল ক্যাটেগরি (সফটওয়্যার ডিজাইন, গেম ডিজাইন, ইত্যাদি) প্যানেল বিচারক দিয়ে ২ রাউন্ড পেরিয়ে তবেই সত্যিকারের পুরষ্কারগুলো দেয়া হয়। আমরা গত দু'বছর ইমাজিন কাপে অংশ নিয়েছি, কিন্তু প্রথম রাউন্ড কোনদিন পার হতে পারিনি।
তারপরও আমি আশাবাদী কোন না কোন বছর, আমাদের দেশী টিম সেটা করে দেখাতে পারবে। সেটাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য, কিন্তু অনলাইন ভোটিং এর এই যুগে অতিরিক্ত প্রচারে মূল প্রাপ্তির জায়গা থেকে আমরা দূরে সরে গিয়ে মন দিয়েছি গণভোটে। তাও যদি সেটা পাওয়া যায় ভালো কথা। নেচে-কুঁদে, হাতে পায়ে ধরে অনেকেই ভোট আদায় করেন, আমি নির্দোষ ভাবেই দেখি। কিন্তু যদি স্ক্রিপ্ট লিখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোট দিতে থাকেন, সেটা টিমের কেউ বা না হন, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাতে নৈতিক সমর্থন দিতে পারছি না। তবে কেউ লুকিয়ে কিছু করলে বেশিরভাগ সময় স্রষ্টাও তা লুকিয়ে রাখেন - তাই সে ব্যাপারে আমার বলার কিছু নেই।
আমি মাইক্রোসফটে কাজ করি না। তবে নানা কাজে তাদের সাথে সরাসরি যুক্ত থেকেছি। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাইক্রোসফটের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। শুধু প্রথমবারেই পিপল'স চয়েস অ্যাওয়ার্ড আমরা পেয়েছি বলেই নয়, বিশ্বের যে কয়টা দেশ বাংলাদেশকে চেনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের সম্ভাবনা দিয়েই মনে রাখে। মাইক্রোসফট এদেশের একপ্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেছে এই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাদের সাথে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি কারিগরি সমস্যা সমাধানে, উপস্থাপনা আর পেশাদার আচরণ নিয়ে। দেশের সেরা বিশেষজ্ঞরা তাদের সাথে কাজ করেছেন - মাইক্রোসফট সেটার ব্যবস্থা করেছে।
বিদেশী শিক্ষার্থীরা অনেক আগেই শিশু-সুলভ আচরণ থেকে বেড়িয়ে পেশাগত জীবনের উপযোগী মনস্তত্ব গঠন করেছেন। কিন্তু এদেশে অপেশাদার শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। ফলে প্রায়ই, আমাদের অনেক অপ্রিয়/উড়ো ই-মেইল পেতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-পর্যায়ে (স্থানীয়) বিচারের আগে ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য অনেক টিমই আমাদের সাথে যোগাযোগ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে আমরা তাদের শিক্ষকদের শরণাপন্ন হই, এবং তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে অনুরোধ জানাই। আমরা যদি এধরনের তথ্য প্রকাশ করি, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে - সেরকম পেশাদারিত্ব আমরা চর্চা করি।
আমাদের তরফ থেকে এত সময়, নিষ্ঠা, শ্রম ও সহনশীলতার পরও যদি যথেষ্ট অনলাইন ভোটের অভাবে ১ থেকে ৩ নেমে যেতে হয়েছে বলে এদেশের অংশগ্রহণকারী দল মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে, সেক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা। আপনিই আমাকে বলুন ১ থেকে ৩ এ নেমে যেতে কয়টা ভোট লাগে? ৬টা - স্রেফ ৬টা ক্লিক দরকার হয়, যার ধুঁয়া তুলে এদেশের অংশগ্রহণকারী দল ইমাজিন কাপকে বাংলাদেশে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।
একটা সময় ছিল, এসব অপচেষ্টা প্রশ্রয় দেয়া হত, কিন্তু এখন ইন্টারনেটের ব্যাপক সহজলভ্যতায় সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাঁচ-ছয় হাজার শিক্ষার্থীকে এক করে তাদের সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করে ইমাজিন কাপকে অজনপ্রিয় করার এই প্রচেষ্টাকে হালকাভাবে নেয়ার কোন অবকাশ নেই। যদি আমি তৎক্ষণাৎ এর প্রতিক্রিয়া না দেখাতাম, একটা সময় এমন হতে পারতো তারা তাদের অন্ধ অনুসারীদের নিয়ে মাইক্রোসফট/ইমাজিন কাপ-বয়কট কর্মসূচী শুরু করতে পারতো, কেননা দেশীয় তোষামোদ, আর উদ্দেশ্যমূলক-লাইকভিত্তিক কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ির বর্তমান সামাজিক নেটওয়ার্ক সংস্কৃতিতে মাইক্রোসফট এ ধরনের স্থানীয় প্রচেষ্টা গত ১২ মাসে অনেকবার মোকাবেলা করেছে। অন্যদিকে এত কিছুর পরও মাইক্রোসফট চূড়ান্ত চেষ্টা করছে ইমাজিন কাপকে এদেশে জনপ্রিয় করার জন্য - তারা তা অব্যাহত রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস।
জিতে যাইনি, তাই আয়োজকরা দুর্নীতিবাজ - এধরনের চিন্তা ধারা থেকে বেরিয়ে এসে, আমাদের উচিত যে কোন ফলাফলকে সহজভাবে নেয়া। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আমি অনেক আগেই এ নিয়ে সতর্ক করেছিলাম। ফলাফল শূন্য। আশা করব, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এগিয়ে এসে ভবিষ্যত দলগুলোকে আরও পেশাদার (কাজে ও কথায়) ও পরিণত করে তুলবে, সাথে সাথে তাদের সফটওয়্যার/গেইমের গুনগত মান ও উপস্থাপনাও বিশ্বমানের করে তুলতে সারাবছর কাজ করে যাবে। আমরা সামনের দিকে তাকিয়ে আছি যখন আমাদের দেশী দল ১ম রাউন্ড, ২য় রাউন্ড পেরিয়ে প্রথম তিনে স্থান করে নিয়ে আমাদের গর্বিত করবে। যদি ব্যর্থও হই, তাতেও সমস্যা নেই, পেশাদার আচরনে এই মহৎ প্রতিযোগীতার পরিবেশ বজায় রাখবো এবং বাংলাদেশকে কখনো একটা বাজে উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করাবো না। তবেই আমাদের পরিশ্রম এবং দেশের মানুষের ভালবাসা স্বার্থক হবে আর মেধাবীরা পাবে মেধার স্বীকৃতি। মনে রাখবেন, গুনীর মর্যাদা দিলেই গুনী তৈরী হবে - আর ভোটের মর্যাদা দিলে ভোটিং জিনিয়াস তৈরী হবে। আমরা কোনটা চাই?
- tsaqib's blog
- Login or register to post comments













