ফেসবুক ও বৃষ্টিভেজা নুপূরের গল্প

p145h's picture

ন্ধ্যার পর থেকেই আকাশ ফুঁড়ে টুপ-টাপ বৃষ্টি পড়ছে । এখন মধ্যরাত; বৃষ্টির ফোঁটা দেখা না গেলেও মেঘের কান্না থেমে নেই; বিরক্তিকর একটানা ঝম ঝম । খটাস করে জানালা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল নুপূর । এমনিতে বৃষ্টি তার খুব.. ‍খুউব পছন্দ । অথচ আজ এই শব্দে মাথা ধরে যাচ্ছে । মাথার উপর বনবন করে ঘুরতে থাকা ফ্যান এর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অজান্তেই চোখ বুঁজে আসলো । চোখের কোণা দিয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা মুক্তো । ভাগ্যিস কেউ দেখে ফেলেনি, নইলে নুপূর কী লজ্জাটাই না পেতো!

rain.png

‘অর্ফিয়ুস’ নামের ফেসবুক আইডিটা বছর দুয়েক আগেই তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলো । দুই-একবার হাই হ্যালো করার চেষ্টাও করেছে, সে পাত্তা দেয়নি । এত এত হাই হ্যালোর মাঝে তাকে আলাদা কিছু মনে হয়নি তার, তাই । এইতো প্রায় মাসখানেক আগে নুপূর ভুলবসত ‘অর্ফিয়ুস’-কে চ্যাট-এ নক করে বসে! একদম ব্যাখ্যাতীতভাবে তার প্রতি একটু একটু আগ্রহ তৈরি হতে থাকে । এইবার উল্টো অর্ফিয়ুসই নুপূরকে এড়িয়ে চলতে থাকে! এখানে দু’জনের একটু বর্ণনা দেওয়া প্রয়োজনঃ

heart.pnglove
নুপূরঃ কাঠিন্যের খোলসে বন্দী ভীষণ ইমোশনাল একটা মেয়ে । মানুষকে অবজ্ঞা করে অভ্যস্ত, পেয়ে নয় । সমাজের হাই সোসাইটির অধিকাংশ মেয়েদের যে সমস্যাগুলো থাকে তার বেশিরভাগই এর মধ্যে অনুপস্থিত । খুব ভালো কবিতা লিখতে জানে, কিন্তু কখনো ফোকাসে আসতে চায় না । গভীরে কি যেন এক দুঃখ রয়েছে ।

অর্ফিয়ুসঃ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে । আত্মসম্মানবোধ বেশি বলে অপমান ভুলতে তার বেশ সময় লাগে । ভার্চুয়াল বন্ধুমহল সে একাই মাতিয়ে রাখতে পারে । বিশেষ গুণগুলোর মধ্যে রয়েছে মন চাইলেই রোবোটিক হয়ে যাওয়া, লজিকাল ব্যাখ্যা দিতে পারা ইত্যাদি । আর অবশ্যই মেয়েদের ব্যাপারে উদাসীন থাকা !
lovelove

প্রতিদিনই নিজের স্বাতণ্ত্র্য ত্যাগ করে নুপূর অর্ফিয়ুসকে আগে নক করতো । অর্ফিয়ুস তাকে যতই অবজ্ঞা করতো, ওর প্রতি নুপূরের ভালোলাগাটা ততোই বেড়ে যেতো । প্রেমের প্রতি বিরূপ নুপূরকে অর্ফিয়ুস প্রেমে ফেলার সরাসরি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসলো, কিন্তু কোন চেষ্টা করলো না ! প্রতিদিনের আড্ডায় প্রতিনিয়ত দূর্বলতা চলে আসছিল দু’জনের মধ্যেই । উভয়ের ভেতরই ছিল যথাসম্ভব রোবোটিক থাকার চেষ্টা ! একে অপরকে খুব ভালোভাবেই বুঝে গিয়েছিলো তারা: কিসে তাদের আনন্দ, কখন দুঃখ ইত্যাদি সব ।

মেয়েটা এই রবিবার ভোরেই কানাডা চলে যাবে, একদম স্থায়ীভাবে । তাই আবেগহীন অর্ফিয়ুস চাচ্ছিল না ক্ষণস্থায়ী দূর্বলতাটা প্রেম পযন্ত টানার ন্যূনতম চেষ্টাও করতে । আর নুপূরকে দিয়ে ভালবাসা ? অসম্ভব ! কিন্তু সে নিজে খুব বাজে অভিনেতা বলেই হয়তো তার কথাবার্তা, আচরণে নুপূর তার প্রতি দূর্বলতা বুঝে গিয়েছিলো! নুপূরও ওকে মিস করছে । বলবে না কোনোদিনও । কিন্তু মনে মনে সে ঠিক করে রেখেছে একটিবারের জন্যও যদি অর্ফিয়ুস বলে সে নুপূরকে ভালোবাসে, সে কখনোই এদেশ ছেড়ে যাবেনা ।

কাল রাতে একটু কথা কাটাকাটি, একটু ঝগড়া ; প্রথমবারের মত । নুপূরের অনেক অনেক কবিতা, আর গানের দু’এক লাইনের গুনগুন শোনানো রাতের শুরুটা মন্দ ছিল না । রিমঝিম শুরু, বজ্রপাত দিয়ে শেষ । নুপূর ভাবতো, সে রোবোটিক থাকার যে অভিনয় করছে, অর্ফিয়ুস সেটা কেন ধরতে পারছে না, গাধা কোথাকার! সে সত্যিই ওকে খুব মিস করে, ভীষষষনননন...!

lovelove

শনিবার সকাল থেকে নুপূর অনলাইনে অনেকবার নক করেছে অর্ফিয়ুসকে । কোন পাত্তা নেই । ফোন-ও সুইচড অফ । তার মন খারাপের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির তেজ বেড়ে চলেছে । শেষ বেলায় এসে তো রীতিমত ঝড় । এখন মধ্যরাত; নুপূর ওই গাধাটার জন্য কাঁদছে ! ওর কোন অজুহাতেই তার রাগ ভাঙবে না, কক্ষনো না । বিছানা ছেড়ে কবিতার খাতা খুলে বসলো সে । খুঁজে খুঁজে সেই কবিতাটা বের করলো যেটা ওর জন্যই লেখা হয়েছিল । কয়েকদিন আগে পড়েও শুনিয়েছে অর্ফিয়ুসকে । আর ওকে বেশ শুনিয়ে দিয়েছে,

“তোমার জন্য কবিতা লেখা? বয়েই গেছে আমার! ”

ব্লিপ ! ব্লিপ !!
ফেসবুকে লগিন করাই ছিলো । কেউ একজন চ্যাট-এ নক করছে । যে খুশি করুক, তাতে নুপূরের কি? ও বসে ছিলো বসেই থাকবে, স্ক্রীনে তাকাবেই না ! যদিও মনের ভেতরে বারবার খোঁচা দিচ্ছে,“ একটু দেখিই না, কে !” শেষ পযন্ত চ্যাট স্ক্রীনে চোখ রাখলো সে । সেখানে লেখা, “I'M IN LOVE WITH YOU, NUPUR” ...

Tags: