দিল্লিকা লাড্ডু ফেসবুক ও আমার ফেসবুকনামা

আমি বরাবরই অসামাজিক কিসিমের মানুষ। তারপরও নিজেকে সামাজিক জীব প্রমাণের মহান উদ্দেশ্য নিয়ে কলেজজীবনে ফেসবুকে যোগ দিলাম। উদ্দেশ্য সফল হোক বা নাহোক চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই। তার উপর ফেসবুকের সবচেয়ে ভালো দিক এই বস্তু ব্যবহারে কোন টাকা-পয়সা লাগেনা- পুরাই ফ্রি! আমি খাঁটি বাঙ্গাল; ফ্রি পেলে আলকাতরাও খাই
যদিও ফেসবুক-কে খাওয়া যাচ্ছেনা তবে নিজের ভাবনাগুলো অন্যকে খাওয়ানো যাচ্ছে। আরও অবাক হয়ে দেখলাম ফেবুতে খুব সহজেই অন্যকে বিভ্রান্ত করা যাচ্ছে। বিপুল উৎসাহ নিয়ে বন্ধু-বান্ধবকে বিভ্রান্ত করতে লেগে পড়লাম। সেই নেংটুকালের বন্ধু থেকে শুরু করে হাফপ্যন্টকাল, ফুলপ্যান্টকাল, একাল-সেকাল কোন কালই বাদ গেল না। ধরো তক্তা মারো পেরেক স্টাইলে ধরো friend মারো add! ফলস্বরূপ চেনা-অচেনা নানান কিসিমের ফ্রেন্ড যুক্ত হয়ে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট হু হু করতে বাড়তেই থাকলো 

মাসখানেক যেতে না যেতেই ফেসবুক-উৎসাহে ভাটা পড়লো। ততদিনে অবশ্য অনেক বন্ধুরা আমার সামাজিকতার দৌড় টের পেয়ে সটকে পড়তে শুরু করেছে
এদিকে অন্যদের বিভ্রান্ত করতে গিয়ে টের পেলাম আমি নিজেই খানিকটা বিভ্রান্ত। এই বিভ্রান্তি আরও বাড়লো খুব চেনাজানা কিছু মানুষের কাজকর্ম দেখে। মজার বিষয় হচ্ছে বাস্তবে যেমনই হই না কেন, ফেসবুকে আমরা সবাই খুব ভালো মানুষ
এমনিতে ইতর-বদমাশ মানুষের অত্যাচারে অতিষ্ট হতে হয়। কিন্তু ফেসবুকে ঢুকলেই পাইকারী হারে ভালো মানুষের দেখা মেলে। তবে হাটে হাঁড়ি ভাংঙ্গার মত করে বাস্তবের অনেক বর্ণচোরা মানুষের আসল রং বেড়িয়ে পড়লো। যেমন, নিতান্তই নিরীহ, পিঠ বাঁচিয়ে চলা এক বড়ভাইকে দেখলাম তার wall-এ একের পর এক জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস দিয়েই চলেছেন। বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা না গেলেও দেখতে দেখতে তিনি ফেসবুক-দুনিয়ার সংগ্রামী নেতা হয়ে বসলেন!
এমন অনেক চেনা মানুষের অচেনা রূপ দেখে থমকে যাই। হজম করতে পারছিলাম না তাই মানেমানে কেটে পড়ব বলে ঠিক করলাম। বড় একটা সময়ের জন্য ফেসবুকের অলীক জগৎ থেকে ডুব দিলাম! 
একপর্যায়ে এসে আবিষ্কার করলাম ফেসবুক নিয়ে আসলে এত বিচলিত হওয়ার তো কিছু নেই! তাই ‘নির্লিপ্ততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’- এই নীতি নিয়ে আবার ফেসবুকে আনাগোনা শুরু। এখন পর্যন্ত এই নীতি বেশ ভালো কাজে দিচ্ছে। কিছু মানুষের গা জ্বালানো হ্যাংলামি, ন্যাকামি আর কৃত্রিমতার ব্যাপারে সহ্যক্ষমতা বেড়েছে। তারপরও ফেসবুক অনেকটা দিল্লিকা লাড্ডু- খেলেও পস্তাবেন, না খেলেও পস্তাবেন। তবে, খেয়ে পস্তানোটাই মনে হয় ভালো!
অবশ্য এরমধ্যে নিজেও অনেকটা শুধরেছি। ফেসবুকের ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিজেকে জনপ্রিয় করার লোভ অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছি। অন্যের মুখে নিজের প্রসংশা শুনার লোভ কাটিয়ে ওঠা খুব কঠিন কাজ। সস্তা জনপ্রিয়তার নেশা বড় খারাপ জিনিষ। সেই নেশা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি বলেই এখন প্রিয় মানুষগুলোর কাজকর্ম দেখে আনন্দ পাচ্ছি। বুকে হাত রেখে বলতে পারি সে আনন্দে কোন খাদ নেই! 

না বলা ভাবনা আর কথাগুলো টপাটপ লিখে ফেলা যাচ্ছে...কেউ পড়ুক আর না পড়ুক নিজের অখাদ্য-কুখাদ্য গদ্য-পদ্য ছাপানো যাচ্ছে..ওদিকে দুষ্ট টাইপের ছেলেপুলে মজার মজার সব গ্রুপ খুলে নিজেরদের সৃজনশীলতা দেখিয়েই চলেছে... নিতান্তই বেরসিক মানুষটাও ছেলেমানুষী রসিকতায় হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে...আরও কত কি! ‘ফেসবুকে শেখার কি আছে’-এই জাতীয় আতেলীয় প্রশ্নের জবাবে সরল উত্তর- ফেসবুক কখনোই মানুষকে শেখানোর ভার নেয়নি। বরং ছোটবেলার হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের খুঁজে পাওয়ার মত অজস্র অন্যরকম ভালো লাগার উপলক্ষ্য নিয়ে ফেসবুক। তাতে ‘গণশিক্ষার আসর’ জাতীয় শিক্ষনীয় কিছু না থাকলেও ক্ষতি নেই!
অনেক বাবা-মাকে নতুন প্রজন্মের ফেসবুক নেশা নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের চিন্তিত হতে দেখছি। এখনকার নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ারা আগের যে কোন জেনারেশনের চাইতে অনেক বেশী স্মার্ট ও বুদ্ধিমান। তাই বাবা-মায়েরা অহেতুক সন্দেহ, খবরদারি ও দুশ্চিন্তা না করে সন্তানের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। একটু খোলা মন নিয়ে তাকালেই দেখবেন ফেসবুক-কে যতটা ভয়ংকর মনে করেছিলেন, আসলে ঠিক ততটা খারাপ নয়। বরং ভালো-খারাপের দাড়িপাল্লায় ফেসবুকের পাল্লাটা ভালোর দিকেই ভারি 

শেষকথাঃ প্রাণীজগতের মধ্যে আমরা মানুষেরা বড়ই বিচিত্র। আমাদের কার্যকলাপ তার থেকে আরও বেশী বিচিত্র। জীবনের বিচিত্র সব কাজকর্মগুলো যদি ফেসবুকের ফ্রেমে বাঁধা পড়ে তবে ক্ষতি কি? ফেসবুকে আচরণের ব্যাকরণ মেনে চলার বাধা নেই। বরং যা করতে ভালো লাগে তা করার মুক্ত স্বাধীনতা আছে। আর এমন ভালো লাগার আনন্দই যেখানে মূলকথা সেখানে কলঙ্ক খোঁজার দরকার দেখিনা। কাজের হোক, অকাজের হোক...হোক ছেলেমানুষী কিংবা অর্থহীন কথাবার্তা...ব্যস্ত জীবনের একচিলতে অবসরে ফেসবুক প্রতিনিয়ত যে আনন্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে তা মোটেই ফেলে দেওয়ার মত নয়! 

- রাফি_মাহমুদ's blog
- Login or register to post comments













