মোবাইল তরঙ্গ কেন রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ? (দ্বিতীয় পর্ব)

Rajib.Shahriar's picture

এই লেখাটি প্রিয়টেকে প্রকাশিত মোবাইল তরঙ্গ কেন রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ? (প্রথম পর্ব) এর ধারাবাহিকতায় লেখা। প্রথম পর্বে সম্পূর্ণ তরঙ্গের (Entire Electromagnetic Spectrum) একটি সামগ্রিক চিত্র দেয়া হয়েছিলো। তারপর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছিলো যে অতি নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে (৩ হার্জ থেকে ৩ কিলোহার্জ) ও অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে (৩০০ গিগাহার্জ থেকে বাকি সবটা) টেলিযোগাযোগের সমস্যাগুলো কি কি। অতি নিম্ন আর অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির মাঝে ৩ কিলোহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জ পর্যন্ত অংশটুকু রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (RF) নামে পরিচিত। এই কিস্তিতে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে টেলিযোগাযোগ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে। আমরা দেখার চেষ্টা করব রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে টেলিযোগাযোগের সুবিধা কি কি এবং কেন। আমরা আরও দেখব যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে কি কি ধরনের টেলিযোগাযোগে করা সম্ভব।

গত পর্বের লেখাটি নেতিবাচক ও হতাশাজনক ছিল কেননা আমরা দেখেছিলাম যে তরঙ্গের একটি বিরাট অংশ টেলিযোগাযোগের জন্য অনুকূলে নয়। সে তুলনায় আজকের লেখাটি পজিটিভ ও আনন্দদায়ক। তরঙ্গের এই অংশটুকু (রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি) আমাদের জন্য আশীর্বাদ কারণ এই অংশ বিভিন্ন ধরনের বেতার যোগাযোগের জন্য আদর্শ গুনাগুন প্রদর্শণ করে। প্রথম সুবিধা হল রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে অ্যান্টেনার সাইজ এমন হয় যা কিনা বাস্তব জীবনে বানিয়ে ব্যবহার করা সম্ভব। মনে আছে নিশ্চয়ই যে অ্যান্টেনার সাইজের সাথে ফ্রিকোয়েন্সির ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক বিদ্যমান অর্থাৎ ফ্রিকোয়েন্সি বাড়লে অ্যান্টেনা সাইজ কমবে। কাজেই অতি নিম্ন আর অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির মাঝে হওয়াতে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে অ্যান্টেনার সাইজ খুব বড়ও হয় না আবার খুব ছোটও হয় না। দ্বিতীয় সুবিধা হল রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিতে বেতার তরঙ্গ (ওয়্যারলেস সিগন্যাল) পাঠানো হলে (অর্থাৎ মোবাইল ফোনের বা রেডিওর সিগন্যালের ফ্রিকোয়েন্সি ৩ কিলোহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জের মাঝে ) তা যখন বায়ুমণ্ডলের (traveling medium of signal) মাঝ দিয়ে যায় এবং প্রকৃতির (গাছ-লতাপাতা, বাড়িঘর, পাহাড়-পর্বত, বৃষ্টি-তুষার ইত্যাদি) সাথে যেভাবে interact করে তা টেলিযোগাযোগের জন্য সুবিধাজনক। মজার ব্যাপার হল সম্পূর্ণ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি টেলিযোগাযোগের জন্য অনুকূলে হলেও এর পুরোটা কিন্তু একই রকম আচরণ করে না; এর বিভিন্ন অংশ প্রকৃতির সাথে বিভিন্নভাবে interact করে। আর এই ভিন্ন ভিন্ন আচরণের কারণেই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের টেলিযোগাযোগের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির ভিন্ন ভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

RFFreq.jpg

উপরের ছবিতে সম্পূর্ণ রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির (৩ কিলোহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জ) একটি সামগ্রিক চিত্র দেওয়া হল। পাঠক, খেয়াল করুন যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সিকে মোট ৮টি ভাগে ভাগ করে দেখান হয়েছে (কম থেকে বেশি ফ্রিকোয়েন্সি ক্রমানুসারে) এবং কোন ভাগ কি কি ধরনের টেলিযোগাযোগে ব্যবহার করা হয়ে থাকে তাও দেখন হয়েছে।

১. RF: Very Low Frequency (VLF):

এর প্রথম ভাগটি হল Very Low Frequency (VLF) যা কিনা ৩ কিলোহার্জ থেকে ২৯ কিলোহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য (wavelength) ১০ থেকে ১০০ কিলোমিটার (জেনে রাখুন যে তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য = আলোর গতি / ফ্রিকোয়েন্সি)। এই VLF ব্যান্ডকে বলা হয়ে থাকে Maritime Band। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে এই ব্যান্ড মূলত সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল (Maritime Navigation) এর জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রশ্ন হল কেন? এই ফ্রিকোয়েন্সিতে খুব বেশি ব্যান্ডউইথ (bandwidth) না থাকাতে কথা (voice) বলার জন্য খুব একটা সুবিধাজনক নয়, আবার উচ্চগতির ডাটা পাঠানোও অসুবিধাজনক। কিন্তু নিম্নগতির ডাটা যেমন মোর্স কোড (টেলিগ্রাফের ON-OFF টাইপ) সিগন্যাল পাঠানো সম্ভব। আরেকটি সুবিধা হল এই ব্যান্ড কিছুটা হলেও পানিতে চলতে পারে (প্রায় ৫০ মিটার) আর তাই অল্প ডুবে থাকা সাবমেরিনেও ব্যবহার করা হয়। এই ব্যান্ডের একটি সমস্যা হল অ্যান্টেনার সাইজ এখনও এটা বড় যে তা ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ব্যাবহার করা বাস্তব নয়। তাছাড়া এই ব্যান্ডের অ্যান্টেনার আরেকটি সমস্যা হল এরা ২০% থেকে ৩০% শক্তিকে (signal strength) সিগন্যালে রূপান্তর করতে পারে, বাকিটা অপচয় হয়। কাজেই অনেক power সরবরাহ করা ছোট্ট একটি ব্যাটারি-চালিত মুঠোফোনে সম্ভব নয়।

২. RF: Low Frequency (LF):

এবার দ্বিতীয় ধাপে আসা যাক, Low Frequency (LF) যা কিনা ৩০ কিলোহার্জ থেকে ২৯৯ কিলোহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য (wavelength) ১ থেকে ১০ কিলোমিটার। যেহেতু এই ব্যান্ডের তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য কিলোমিটারে তাই এই ব্যান্ডকে কিলোমিটার ওয়েভও বলা হয়ে থাকে। আগের ধাপের মত এই ধাপও মূলত ন্যাভিগেশনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে আমেরিকা, ইয়োরোপ আর আর এশিয়াতে এই ব্যান্ডের কিছু অংশ AM Radio সিগ্যনাল সম্প্রচার করা হয়ে থাকে (তাদের পরিভাষায় Longwave বা LW)। তবে বেশিরভাগ AM Radio সিগ্যনাল সম্প্রচার Medium Frequency বা MF তেই হয়ে থাকে। এই ব্যান্ডের অ্যান্টেনা সাইজও মুঠোফোনের জন্য বাড়াবাড়ি রকমের বড়।

৩. RF: Medium Frequency (MF):

এবার তৃতীয় ধাপে আসা যাক, Medium Frequency (MF) যা কিনা ৩০০ কিলোহার্জ থেকে ৩ মেগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য (wavelength) ১০০ মিটার থেকে ১ কিলোমিটার। এটাই হল AM Radio সিগন্যাল সম্প্রচারের মূল ব্যান্ড যা কিনা Medium Wave বা MW নামে পরিচিত (রেডিওর গায়ে লেখা দেখতে পাবেন)। আমেরিকাতে ৫৩৫ কিলোহার্জ থেকে ১৭০৫ কিলোহার্জ পর্যন্ত এবং ইয়োরোপে ৫২৫ কিলোহার্জ থেকে ১৬০৬ কিলোহার্জ পর্যন্ত AM Radio সিগন্যাল সম্প্রচার করা হয়ে থাকে। রেডিও সম্প্রচারের জন্য এই ব্যান্ড বেছে নেওয়ার কারণ হল এই ব্যান্ডে সিগন্যাল পাঠাতে (transmit) অনেক বড় অ্যান্টেনা লাগে (দেখুন রেডিও স্টেশনের অ্যান্টেনা) অথচ সিগন্যাল গ্রহণ (receive) করতে ছোট্ট অ্যান্টেনা লাগে, যেমনঃ আমাদের ট্রান্জিস্টর বা রেডিও অ্যান্টেনা কত ছোট অথচ রেডিও স্টেশনের অ্যান্টেনা কত বড়। কাজেই দুই দিকের যোগাযোগের জন্য (two way communication) এই ব্যান্ড বেশ অসুবিধাজনক, যেমনঃ মোবাইলে কথা বলা ও শোনা।

৪. RF: High Frequency (HF):

এবার চতুর্থ ধাপে আসা যাক, High Frequency (HF) যা কিনা ৩ মেগাহার্জ থেকে ২৯ মেগাহার্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য (wavelength) ১০ মিটার থেকে ১০০ মিটার। এই ব্যান্ড অনেক দূরে যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বলছি এখানে। ৮০ এর দশকে আপনারা যারা ছিলেন তারা নিশ্চয়ই দেশে বসে রেডিওতে অস্ট্রেলিয়াতে হওয়া ক্রিকেট ম্যাচের ধারাবিবরণী শুনেছেন শর্টওয়েভে। এই শর্টওয়েভ (Shortwave) হল ২.৩১০ থেকে ২৫.৮২০ মেগাহার্জ। শর্টওয়েভ কেন দূরে যোগাযোগের জন্য ভাল তা বুঝতে নিচের ছবিটি দেখুন কিভাবে এই ব্যান্ডের সিগন্যাল বায়ুমণ্ডলে (Ionosphere) বাঁধা পেয়ে ফিরে যাচ্ছে আবার মাটিতে/পানিতে বাঁধা পেয়ে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

skywave.jpg

এই পিং-পং বলের মত চলাচলের কারণেই এই ব্যান্ডের সিগন্যাল অনেক দূরে চলে যাতে পারে এবং মজার কথা হল সিগন্যালের শক্তি (signal strength) খুব একটা কমে না, বা কমলেও কাজ চালানোর মত অবশিষ্ট থাকে। এজন্য একে Skywave'ও বলা হয়। তাছাড়া প্রায় পুরো HF ব্যান্ডই বিমান চলাচলে ব্যবহার করা হয়। কাজেই এই ব্যান্ডে যদি মোবাইল ফোন চালাতে চান তবে অধিক দূরত্বের টেলিযোগাযোগ আর বিমানের যোগাযোগও কাটা পড়তে পারে। তাছাড়া আরেকটি সমস্যা হল এই ব্যান্ডের সিগন্যাল যেহেতু অনেক দূরে চলে যায় সেহেতু এক বেজ-স্টেশনের সিগন্যাল আরেক বেজ-স্টেশনে গিয়ে ঝামেলা পাকাবে (interference create করবে)। তাছাড়া মোবাইল কোম্পানিগুলো এত ব্যবহারকারী নিতে পারার একটি মূল কারণ হল তরঙ্গের পুণঃব্যবহার (Frequency Reuse) - এক বেজ-স্টেশনের সিগন্যাল পার্শ্ববর্তী বেজ-স্টেশনে যাবার আগেই শক্তি খুইয়ে ফেলে; আর তাই তাই একই তরঙ্গ কিছু দূরত্ব পর পর অন্য কোন ব্যবহারকারীকে দিতে পারে। যদি শর্টওয়েভে মোবাইল কোম্পানিগুলো সিগন্যাল পাঠানোর ধান্দা করে তবে ঢাকার বেজ-স্টেশনের সিগন্যাল যাবে দিল্লি আর দিল্লিরটা এখানে আসবে। ফলাফল - মোবাইল ব্যবসা লাটে উঠবে। কাজেই বুঝতেই পারছেন এই ব্যান্ডে মোবাইলে চালাতে হলে আবার নতুন করে অনেক গবেষণা করতে হবে যাতে করে এই সাথে রেডিও, বিমান আর বেজ-স্টেশন চলতে পারে এবং এটা করলেও interference কতটুকু কমানো যাবে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ।

এই পর্বে আপাতত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির নিচের দিকের চারটি ভাগ নিয়ে আলোচনা করা হল। আগামী কিস্তিতে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির বাকি চারটি ভাগ নিয়ে এবং মাইক্রোওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ে আলোচনা করার আশা রাখছি।

(চলবে)

একই রকম আরো কিছু পোস্ট