মোবাইল তরঙ্গ কেন রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ? (প্রথম পর্ব)

সম্প্রতি বিটিআরসি তৃতীয় প্রজন্মের (৩জি) মোবাইল ফোনের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে এবং এ নিয়ে তারা একটি নীতিমালার খসড়াও প্রকাশ করেছে। বলাই বাহুল্য যে এই ঘোষণা ধীর গতির ইন্টারনেট ব্যবহারে বিরক্ত দেশের আপামর জনসাধারণকে স্বপ্ন নতুন করে দেখাচ্ছে। আর তাই বিটিআরসির এই সাম্প্রতিক কাজ-কর্ম দেশের প্রায় সব মানুষই বেশ আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। এ নিয়ে অনেকের মনেই অনেক প্রশ্ন জাগছে; বিশেষ করে কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকগুলোতে। সময়ের অভাব, জানার সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি বাস্তবিক কারণেই সবকিছু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে পর্যায়ক্রমে একাধিক ব্লগে কিছু কিছু কমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আজকে ব্লগে থাকবে শুরুর কিস্তি।

প্রথমেই খসড়ার যে অংশগুলোর আলোচনা এখানে করা হবে তার একটি ‘রি-ক্যাপ’ দেওয়া যাক। প্রিয়টেক এর খরব অনুযায়ী খসড়া নীতিমালায় পাঁচটি অপারেটরকে ৩জি প্রযুক্তির লাইসেন্স দেওয়ার সুবিধা রাখা হয়েছে। উন্মুক্ত নিলামে প্রতি মেগাহার্জ তরঙ্গের (bandwidth) মূল্য নূণ্যতম ৩০ মিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে একেকটি অপারেটর ১০ মেগাহার্জ তরঙ্গ পাবে। ফলে তরঙ্গের ফ্লোর প্রাইস হবে অপারেটর প্রতি ৩০০ মিলিয়ন ডলার। যতদূর জানা যায় ৯০০, ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের (center frequency of the signal) কিছু অংশ ৩জি'র জন্য বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বর্তমানে ব্যবহৃত দ্বিতীয় প্রজন্মের (২জি) মোবাইল ফোনের তরঙ্গর জন্যও বিটিআরসি নতুন করে তরঙ্গ মূল্য নির্ধারণ করেছে।
মোবাইল কোম্পানিগুলোর সেই মূল্য ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি খুব একটা পছন্দ হয়নি বিধায় তারা বিষয়টি আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছেন। ২জি, ৩জি, বিটিআরসি, মোবাইল কোম্পানি, হাজার হাজার কোটি টাকার নিলাম আর আইন-আদালত ইত্যাদি ডামাডোলে যে বিষয়টি খালি চোখেই প্রকটভাবে ধরা পড়ে তা হোল মোবাইল তরঙ্গের উচ্চ মূল্য। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে কেনইবা বিটিআরসি ভিলেনের মত মোবাইল কোম্পানিগুলোর কাছে উচ্চ মূল্যে তরঙ্গ বিক্রি করছে যাতে করে কিনা আখেরে সাধারণ ব্যবহারকারীদের পকেট কাটা যাবে।
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হোল - মোবাইল তরঙ্গ সীমিত সম্পদ। সীমিত যে কোন কিছুই বেশ মূল্যবান, আর তাই সরকার চাইবেই সে সম্পদ থেকে মুনাফা আদায় করতে। বিশেষ করে যদি ৩য় কেউ যদি সে সম্পদকে পুঁজি করে ব্যবসা করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে সরকার বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে গ্যাস বিক্রি করছে, আবার বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো নাগরিকদের বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। ঠিক তেমনি সরকার তরঙ্গ বিক্রি করবে আর মোবাইল কোম্পানিগুলো তা ব্যবহার করে মোবাইল সার্ভিস বিক্রি করে মুনাফা করবে। ব্যবসার মুনাফা যতটা বেশি হবে তার কাঁচামালের মূল্যও ততটা বেশি হবে। এবার তাহলে দেখা যাক কেন মোবাইল তরঙ্গকে সীমিত সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, একটু সাইন্টিফিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
হাই স্কুলের বিদ্যা থেকে আর একটু কমন-সেন্স ব্যবহার করেই আমরা বলতে পারি যে মোবাইল সিগন্যাল সহ যে কোন সিগন্যালেরই একটি ফ্রিকোয়েন্সি থাকে। এই ফ্রিকোয়েন্সি ১ হার্জ থেকে শুরু করে হাজার বা লাখ বা কোটি বা তারও বেশি হার্জ হতে পারে।, অর্থাৎ প্রায় অসীম বলা যায়। তাহলে আর মোবাইল তরঙ্গকে সীমিত বলা হচ্ছে কেন? বলা হচ্ছে এই কারণে যে প্রাকৃতিক ও মানবীয় সীমাবদ্ধতার কারণে সব ফ্রিকোয়েন্সিতে সব ধরনের সিগন্যাল পাঠানো যায় না।

পাশের ছবিতে সম্পূর্ণ তরঙ্গের (স্পেকট্রামের) ছবি দেখা যাচ্ছে। ৩ হার্জ থেকে ৩ কিলোহার্জ পর্যন্ত নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সি, ৩ কিলোহার্জ থেকে ৩০০ গিগাহার্জ পর্যন্ত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (মাইক্রোওয়েভ সহ), তার পরের অংশটুকু মূলত উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সি।
মজার ব্যাপার হোল বেতার তরঙ্গ (ওয়্যারলেস সিগন্যাল) কোথা দিয়ে যাচ্ছে (traveling medium of signal) তার উপরেও এর আচরণ নির্ভর করে। যেমন ধরা যাক ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল বাতাসের মধ্যে দিয়ে চলতে পারলেও পানিতে ভালোভাবে পারে না। পানিতে খুব দ্রুতই ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল মরে যায়। এই জন্যই পানিতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যালের বদলে শব্দ তরঙ্গ (acoustic) ব্যবহৃত হয়। উদাহরণ - গাবতলির সেতু ভেঙে যখন বাস পরে গিয়েছিল তখন সোনার (sonar) ব্যবহার করে বাসটিকে খুঁজে বের করা হয়েছিল। একই কারণে যুদ্ধ জাহাজে সোনার ব্যবহার করে শত্রু সাবমেরিন সনাক্ত করা হয়। মোবাইল, টিভি, রেডিও, স্যাটেলাইট ইত্যাদি যেহেতু বাতাসের মধ্যে দিয়েই চলাচল করবে তাই শব্দ তরঙ্গ নয়, বরং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হোল সব ফ্রিকোয়েন্সিতে মোবাইল সিগন্যাল পাঠানো সুবিধাজনক না কেননা বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি প্রকৃতির সাথে বিভিন্নভাবে রিঅ্যাক্ট করে।
সিগন্যাল ট্রান্সমিশন ও রিসেপশন এর কথা বললেই সবার আগে বলতে হয় অ্যান্টেনার কথা। আর অ্যান্টেনার সাইজের সাথে ফ্রিকোয়েন্সির ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। যার মানে হোল ফ্রিকোয়েন্সি বাড়লে অ্যান্টেনা সাইজ কমবে। অতি নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে অ্যান্টেনা সাইজ এতটাই বড় হবে যে তা বাস্তবিক-ভাবে তৈরি করা কঠিন ও ব্যবহার অসম্ভব, বিশেষ করে পারসোনাল মোবাইল ডিভাইসে। যেমনঃ ৭০০ মেগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সি জন্য যেখানে একটি হাফ ওয়েভ-লেংথ ডায়াপোল অ্যান্টেনা সাইজ হবে ৮ ইঞ্চির মত, সেখানে ৩০০ কিলোহার্জ ফ্রিকোয়েন্সির জন্য তা হবে ২.৫ কিলোমিটার! আর এটাই হোল অতি নিম্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে সিগন্যাল পাঠানোর (transmission) মূল সমস্যা। আপনি চাইলেও এত বড় সাইজের অ্যান্টেনা বানিয়ে আপনার রেডিও বা মোবাইল ফোনের সাথে জুড়ে দিতে পারবেন না। আর তাই আরেকটু বেশি ফ্রিকোয়েন্সিতে ফোনের সিগন্যাল পাঠানো হয়ে থাকে। রেডিও আর মাইক্রোওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে অ্যান্টেনার সাইজ ছোট হয়ে একটি সহনশীল ও বাস্তব জীবনে ব্যবহার করা যায় এমন সাইজে আসে। আর তাই রেডিও আর মাইক্রোওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে টেলিযোগাযোগ করা হয়ে থাকে।
এবার আসা যাক অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির কথায়। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবং মাইক্রোওয়েভ এর পরেই হোল, ইনফ্রারেড, দৃশ্যমান রশ্মি, অতিবেগুনি রশ্মি, এক্স-রে, ও গামা রশ্মি। ফ্রিকোয়েন্সির সাথে অ্যান্টেনা সাইজের কথা আগেই একবার বলেছিলাম যে অ্যান্টেনা সাইজের সাথে ফ্রিকোয়েন্সির সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক। এই সূত্র মতে এই সব অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির ক্ষেত্রে অ্যান্টেনা সাইজ এতটাই ছোট হবে যে তা বানানোই বেশ কষ্টকর হয়ে যাবে। এছাড়া আরও কিছু বাস্তব সমস্যা আছে এইসব ফ্রিকোয়েন্সির।
ইনফ্রারেড এবং দৃশ্যমান রশ্মির মজার সমস্যা হোল এরা কোন কঠিন বস্তু ভেদ করে যেতে পারে না। যেমন বাড়ির দেওয়াল ভেদ করে সূর্যের আলো আসতে পারে না। ইনফ্রারেড বেলায়ও এ কথাটি সত্য। ইনফ্রারেড কিছু কিছু ওয়্যারলেস যন্ত্রে ব্যবহার হয়, যেমন টিভি রিমোট। ইনফ্রারেড সুবিধা হোল অল্প দূরত্বে ভালো মত ডাটা আদান প্রদানের কাজ করে, কিন্তু বেশি দূরত্বে সিগন্যাল পাওয়ার খুব দ্রুতই কমে যায়। কিন্তু ইনফ্রারেড ভৌতিক (ফিজিক্যাল) বাঁধা পেলে ভেদ করতে পারে না। আর তাই পাশের রুম থেকে টিভি রিমোট কাজ করে না।
অতিবেগুনি, এক্স রে, ও গামা রশ্মি এই তিনটি ফ্রিকোয়েন্সি মানুষে শরীরে নানারকম ক্ষতি করে থাকে। অতিবেগুনি রশ্মি মানুষের ত্বককে পুড়িয়ে দেয় (সান বার্নের কারণ কিন্তু এটিই!) এবং ত্বকের ক্যান্সার সৃষ্টির অন্যতম কারণও সূর্যের মাঝে উপস্থিত অতিবেগুনি রশ্মি। এক্স-রে, ও গামা রশ্মির ক্ষতির কথা তো মনে হয় পাঠকদের মনে করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। এক্স-রে, ও গামা রশ্মির বিকিরণ মানুষের সব কলকব্জা নষ্ট করে দিতে পারে। সুতরাং এই সব অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির কোন ধরনের টেলিযোগাযোগে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
আপাতত অতি নিম্ন ও অতি উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সিতে টেলিযোগাযোগের সমস্যাগুলো বলা হোল। আগামী কিস্তিতে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ও মাইক্রোওয়েভ ফ্রিকোয়েন্সিতে কি কি ধরনের টেলিযোগাযোগে করা সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
(চলবে)
- Rajib.Shahriar's blog
- Login or register to post comments













